আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭ জুন, ২০২৬, ১০:১০ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ইরানকে নজরদারিতে রাখতে প্রতিবেশীদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটি: সিএনএনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

তেহরানের সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, পারমাণবিক স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ এবং যুদ্ধকালীন কৌশলগত সুবিধা পেতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে গোপনে সামরিক ও গোয়েন্দা ঘাঁটি স্থাপন করেছে ইসরায়েল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে প্রকাশ করা এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাক ছাড়াও আজারবাইজান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও আফ্রিকার সোমালিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে ইসরায়েলের একাধিক গোপন সামরিক আস্তানা রয়েছে।

চারটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, চলমান ইরান যুদ্ধের সময় আজারবাইজানে গোপনে নিজেদের এলিট সামরিক ও গোয়েন্দা ইউনিট মোতায়েন করেছিল ইসরায়েল। ইরান সীমান্তসংলগ্ন আজারবাইজানের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় অবস্থান নিয়ে মূলত ইরানের উত্তরাঞ্চলের অভ্যন্তরে নজরদারি চালাত এই বিশেষ দল। এই অভিযানে ইসরায়েলের স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সদস্য, হেলিকপ্টার-ভিত্তিক এলিট উদ্ধারকারী দল, বিশেষ কমান্ডো ইউনিট এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কর্মকর্তারা শামিল ছিলেন। তারা মূলত অত্যাধুনিক ড্রোন পরিচালনা ও তথ্য সংগ্রহের কাজ করতেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এর মধ্যে একটি গোপন ঘাঁটি ছিল ইরানের তাবরিজ শহর থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে, যেখানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। এই আজারবাইজান থেকেই গত ৪ মার্চ এক বড় অভিযানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান রহমান মোঘাদ্দামকে হত্যা করা হয়। ইসরায়েলের দাবি, মোঘাদ্দাম ছিলেন ২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যা চেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী। পরবর্তীতে ইসরায়েল প্রকাশ্যেই স্বীকার করে যে, এটি ছিল মোসাদ, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও আজারবাইজানের নিরাপত্তা সংস্থার একটি যৌথ অপারেশন। যদিও ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আজারবাইজান দূতাবাস তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরাক সরকারের কোনো অনুমতি ছাড়াই দেশটির ভেতরে দুটি গোপন ঘাঁটি তৈরি করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও নিউইয়র্ক টাইমস গত ১০ মে প্রথম এই তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় জনমানবশূন্য নাজাফ মরুভূমিতে সাদ্দাম হোসেনের একটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিতে গোপনে আস্তানা গেড়েছিল ইসরায়েলিরা, যা প্রথম একজন ইরাকি মেষপালকের চোখে ধরা পড়ে। এই ঘাঁটিগুলো মূলত রসদ সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও জরুরি উদ্ধার অভিযানে ব্যবহৃত হতো।

অন্যদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের বরাতে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গোপনে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়ন ডোম’ ও তা পরিচালনার জন্য সেনা পাঠিয়েছিল ইসরায়েল। এমনকি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মোসাদ প্রধান ও ইসরায়েলি সেনাপ্রধান গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন। তবে আমিরাত সরকার এই সফরের খবর জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই, অর্থাৎ গত জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ইরানে যখন ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল, তখনই এই গোপন ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি শুরু করে ইসরায়েল। রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম যুদ্ধবিমান ও বিশেষ বাহিনীকে ব্যবহার করে ইরান সীমান্তে আড়িপাতার যন্ত্রসহ আধুনিক গোয়েন্দা সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়। প্রাথমিকভাবে এসব ঘাঁটি জরুরি পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমানের পাইলটদের উদ্ধারের নামে তৈরি করা হলেও পরবর্তীতে প্রত্যেকটির পরিধি বাড়িয়ে সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার শুরু হয়। এর ফলেই তেহরান থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও ইরানের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে একের পর এক ইসরায়েলের নিখুঁত বিমান হামলার রহস্য পরিষ্কার হয়।

সিএনএন আরও জানায়, ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলে অবস্থিত সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা বন্দর নগরীতেও ইসরায়েলের বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। দূরপাল্লার অভিযানে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো মূলত সেখান থেকে জ্বালানি নিত বা যাত্রা বিরতি করত। গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলই প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।

স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক জোশুয়া কুচেরার মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বড় diplomatic বা কূটনৈতিক সুবিধা পায় আজারবাইজান। ওয়াশিংটনে থাকা ইসরায়েলি লবিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে বাকু। কুচেরা আরও বলেন, আজারবাইজান নিজেকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর আরব দেশগুলোর মধ্যে একটি সেতু বা মাধ্যম হিসেবে বাকুকে কাজে লাগাতে চায় ইসরায়েল।

বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকে আজারবাইজান ইসরায়েলকে তেলের একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। বিনিময়ে ইসরায়েল আজারবাইজানের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রি করে, যা ২০১৬ ও ২০২০ সালে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করেছিল বাকু। বেগিন সাদাত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ গারসন কোগানের মতে, আজারবাইজানে ইসরায়েলের কৌশলটি ইচ্ছাকৃতভাবেই খুব গোপন রাখা হয়, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে চলে।

সিএনএনের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান এই আঞ্চলিক সংঘাতের নেপথ্যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশীরা কতটা গভীরভাবে জড়িত, যার অনেক কিছুই হয়তো স্থানীয় প্রশাসনের অজান্তেই ঘটেছে।

মন্তব্য করুন