আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭ জুন, ২০২৬, ১০:২৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

গ্রেট নিকোবর মেগা প্রকল্প: ভারতের কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপরীতে পরিবেশ ও আদিবাসী অস্তিত্বের সংকট

ছবি: সংগৃহীত

নয়াদিল্লি: ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরে, বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপ। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপকে কেন্দ্র করে নরেন্দ্র মোদির সরকার প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি (১১ বিলিয়ন) ডলারের এক বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই প্রকল্প ঘিরে একদিকে যেমন ভারত মহাসাগরে নয়াদিল্লির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে এর ভয়াবহ পরিবেশগত ও মানবিক প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

মেগা প্রকল্পের রূপরেখা ও বিপুল বিনিয়োগ

হংকংয়ের সমান আয়তনের এই দ্বীপে বর্তমানে ১০ হাজারের কম মানুষের বসবাস। ১৯৮৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পর ভারতের আর কোনো শীর্ষ নেতা সেখানে যাননি, এমনকি সেখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ আদমশুমারিও হয়নি। তবে সরকারের নতুন অনুমোদিত এই মহাপরিকল্পনায় দ্বীপটিতে একটি ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট (পণ্য খালাসের বন্দর), একটি বেসামরিক-সামরিক বিমানবন্দর, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। আগামী তিন দশকে এখানে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বাসযোগ্য এক বিশাল জনপদ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মালাক্কা প্রণালিতে ভারতের 'অতন্দ্র প্রহরী'

গ্রেট নিকোবরের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান, যা বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী মালাক্কা প্রণালির পশ্চিম প্রবেশপথের ঠিক মুখেই অবস্থিত। হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক টানাপোড়েন নয়াদিল্লিকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কতটা জরুরি।

মালাক্কা প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য পরিচালিত হয়। বিশেষ করে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৮০ শতাংশ এবং মোট বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশই এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই দ্বীপ চীনের বিরুদ্ধে নজরদারির জন্য ভারতের একটি মূল্যবান ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক ভাইস চিফ শেখর সিনহার মতে, "এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা সব জাহাজের ওপর নজর রাখতে গ্রেট নিকোবর একটি চমৎকার জায়গা। এটি সমুদ্রসীমায় ভারতের নজরদারির সক্ষমতাকে অনেক বাড়িয়ে দেবে।" নয়াদিল্লিভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্তও মনে করেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে কৌশলগত সুবিধা পেতে ভারতের এই ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগানো অত্যন্ত স্বাভাবিক।

আদিবাসীদের জন্য 'মৃত্যুদণ্ড' ও চরম পরিবেশগত ঝুঁকি

ভূরাজনৈতিক এই সুবিধার বিপরীতে মেগা প্রকল্পের ভয়াবহ নেতিবাচক দিক নিয়ে সরব হয়েছেন পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার কর্মীরা। প্রকল্পটির জন্য ১৬৬ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার অর্ধেকই আদিবাসীদের সংরক্ষিত এলাকা।

দ্বীপের গভীর অরণ্যে বসবাসকারী যাযাবর 'শম্পেন' জনগোষ্ঠী এবং নিকোবরি আদিবাসীদের অস্তিত্ব এই প্রকল্পের ফলে চরম হুমকির মুখে পড়বে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৯ জন আন্তর্জাতিক গণহত্যা বিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, এই প্রকল্প শম্পেনদের জন্য কার্যত 'মৃত্যুদণ্ডের' শামিল, যা জাতিগত নিধনের পর্যায়ে পড়ে।

এছাড়া ভারতের পরিবেশমন্ত্রীর তথ্য মতেই, এই উন্নয়নের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার গাছ কাটা পড়বে। দ্বীপটি ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা 'সিসমিক জোন ৫'-এর আওতাভুক্ত হওয়ায় এমন বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামিতেই দ্বীপটির দক্ষিণ প্রান্তের ইন্দিরা পয়েন্টের একটি বড় অংশ তলিয়ে যাওয়ার স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও দেশীয় তীব্র সমালোচনা

শুরুতে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে এই প্রকল্পকে প্রচার করা হলেও, বিরোধীদের তোপের মুখে মোদি সরকার এখন একে 'জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিরক্ষার' মোড়ক দিচ্ছে। ভারতের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি দ্বীপটি পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি এই প্রকল্পকে "প্রাকৃতিক ও আদিবাসী ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি ও গুরুতর অপরাধ" বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আন্দামান ও নিকোবর ট্রাইবাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সাবেক গবেষক মনিষ চান্ডি সরকারের এই উদ্যোগকে 'প্রচণ্ড ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রকাশ' বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, "এখানে মূল লক্ষ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সম্প্রসারণ নয়; বরং এটি এমন একটি বাণিজ্যিক প্রস্তাব যার প্রভাব ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এটি ভারতের প্রতিরক্ষার জন্য উল্টো একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।"

দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত মহাসাগরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের এই চেষ্টা ভারতের জন্য শেষ পর্যন্ত কতটা ভূরাজনৈতিক সুফল বয়ে আনবে, আর তার বিনিময়ে অমূল্য জীববৈচিত্র্য ও আদিবাসীদের যে চড়া মূল্য চোকাতে হবে—তার মধ্যকার সঠিক ভারসাম্য রক্ষাই এখন এই মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

মন্তব্য করুন