প্রকাশিত: ৭ জুন, ২০২৬, ১০:১৭ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ ও তরুণ মুক্তপেশাজীবীদের উৎসাহিত করতে ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে অর্জিত বৈদেশিক আয়ের ওপর আরোপিত সাড়ে ৭ শতাংশ উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় আগামী অর্থবছর থেকে আয়কর আইনে এই ঐতিহাসিক সংশোধনী আনতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আসন্ন বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে এই জনবান্ধব ঘোষণা দেবেন বলে দায়িত্বশীল সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা গেছে।
বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান বা পক্ষকে সেবা ও পণ্যের বিনিময়ে যে অর্থ দেশে আনেন, তা করমুক্ত প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স হিসেবে গণ্য হতো না। এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় ব্যাংকগুলো ফ্রিল্যান্সার (মুক্তপেশাজীবী) এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের (ডিজিটাল সামগ্রী নির্মাতা) আনা অর্থের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখত। পক্ষান্তরে, প্রবাসে অবস্থান করে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা যে অর্থ পাঠান, সেটিকে রেমিট্যান্স হিসেবে গণ্য করে কোনো কর কাটা হয় না।
এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কারণে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। এই সংকট নিরসনে সম্প্রতি বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডাচ-বাংলা ব্যাংক তাদের দাপ্তরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মুক্তপেশাজীবীদের আয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন স্থগিতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি ব্যাংকটি জানিয়েছে, যেসব গ্রাহকের হিসাব থেকে আগে কর কেটে নেওয়া হয়েছে, সেই অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১ জুন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একটি জনপ্রিয় ফেসবুক পেজের প্রতিষ্ঠাতা ও কনটেন্ট নির্মাতা জুয়েল রানা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠককালে তিনি মুক্তপেশাজীবী ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তরুণদের আয়ের ওপর কর আরোপের ফলে সৃষ্ট মাঠপর্যায়ের জটিলতা ও উদ্বেগের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন। প্রধানমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ তরুণদের এই সংকট দূর করতে বিষয়টি খতিয়ে দেখার এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার পরই মূলত এনবিআর এই কর প্রত্যাহারের আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, নতুন আয়কর আইনে প্রথমবারের মতো 'কনটেন্ট ক্রিয়েটর'-দের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা যোগ করা হবে। তবে মুক্তপেশাজীবীদের অর্জিত বৈদেশিক আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত ঘোষণা করা হলেও, তারা দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী প্রচার (ব্র্যান্ড প্রমোশন) বা পৃষ্ঠপোষকতার (স্পনসরশিপ) মাধ্যমে যে স্থানীয় অর্থ আয় করবেন, তার বিপরীতে সাধারণ নিয়মিত করদাতাদের মতোই নির্ধারিত হারে আয়কর প্রদান করতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও মুক্তপেশা খাতকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের একটি অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল। দলটির ইশতেহারে সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) পাঁচটি আধুনিক প্রযুক্তি খাতে দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট তৈরিতে আট লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর অংশ হিসেবে ১০ বছরের কর সুবিধা, ই-ওয়ালেট চালু, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র স্থাপন এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত ঋণ ও স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, কেবল তথ্যপ্রযুক্তি খাতই নয়, জনস্বার্থ ও ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার আরও বেশ কিছু কর নীতিতে বড় ধরনের সংশোধন এনেছে। এর আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও জনস্বার্থে তা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর প্রস্তাবিত কর, সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার করের পরিকল্পনাও পুরোপুরি বাতিল করেছে সরকার। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রণোদনার ওপর বাড়তি কর আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে ইউটার্ন নিয়ে তা অর্ধেক করা হয়েছে এবং ব্যাংক আমানতের আবগারি শুল্কের নিম্নসীমা তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন