প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ১২:৩১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
দেশের শীর্ষ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের খুচরা ব্র্যান্ড ‘স্বপ্ন’র জনসংযোগ বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে কথিত কমিশন বাণিজ্যের বিস্তৃত অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিজ্ঞাপন বরাদ্দের নামে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির এক সাবেক কর্মকর্তা হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ায় বিষয়টি সামনে আসে। গত ৮ মার্চ অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তা দায়িত্ব ছাড়াই উধাও হন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির মিডিয়া অ্যান্ড জনসংযোগ বিভাগের সাবেক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রায় ছয় বছর ধরে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র, অনলাইন মাধ্যম ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন দেয়ার শর্তে অগ্রিম কমিশন আদায় করছিল। অভিযোগ রয়েছে, বিজ্ঞাপনের বাজেট যত বড় হতো, কমিশনের পরিমাণও তত বাড়তো।
ভুক্তভোগী একাধিক গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক জানিয়েছেন, স্বপ্ন’র বিজ্ঞাপন পেতে হলে আগে থেকেই নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হতো। প্রতি লাখ টাকার বিজ্ঞাপনের বিপরীতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন আদায় ছিল নিয়মিত প্রক্রিয়া। এই অর্থ কখনও নগদ, কখনও মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে নেয়া হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের কার্যাদেশ পাওয়ার আগেই কমিশন পরিশোধ করতে হতো এবং পরে প্রতিষ্ঠানটির প্যাডে স্বাক্ষরিত কার্যাদেশ পাঠানো হতো।
দীর্ঘদিন একই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন প্রকাশ ও বিল উত্তোলন হওয়ায় অনেকেই এটিকে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার অংশ বলে মনে করেছিলেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের শুরুতে বছরব্যাপী বিজ্ঞাপন প্রচারণার নামে নতুন করে বড় অঙ্কের প্রস্তাব দেয়া হয় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংস্থাকে। সেই সুযোগে কয়েক কোটি টাকা অগ্রিম কমিশন সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ। তবে গত ৮ মার্চ হঠাৎ করেই মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলু নিখোঁজ হয়ে যান। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায় এবং অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৫ কোটি টাকা নিয়ে তিনি দেশ ছেড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর একের পর এক ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানটির তেজগাঁও কার্যালয়ে যোগাযোগ শুরু করেন। তবে তাদের অভিযোগ, বিষয়টি জানানো হলেও কর্তৃপক্ষ দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।
একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের মালিক বলেন, “আমার সঙ্গে এক বছরের বিজ্ঞাপন চুক্তি হয়েছিল। ছয় লাখ টাকার কার্যাদেশের বিপরীতে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা কমিশন দিয়েছি। এখন বিজ্ঞাপনের বিলও পাচ্ছি না, কমিশনের টাকাও গেল।”
আরেক গণমাধ্যম মালিক জানান, ১৬ লাখ টাকার বিজ্ঞাপনের আশ্বাসে তিনি প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা অগ্রিম কমিশন দেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানের কয়েক লাখ টাকার বিল বকেয়া রয়েছে।
একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিকের দাবি, ৩৬ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন কার্যাদেশের বিপরীতে তার কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা কমিশন নেয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, বর্তমানে বকেয়া বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও নতুন করে অতিরিক্ত খরচ বা কমিশনের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। এতে সম্মত হলে আংশিক বিল বা নতুন বিজ্ঞাপন মিলছে, আর আপত্তি তুললে বিভিন্ন অজুহাতে বিল আটকে রাখা হচ্ছে।
ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির উচ্চপর্যায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগীদের মতে, এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন বড় আকারের কমিশন বাণিজ্য একজন কর্মকর্তার পক্ষে এককভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাদের দাবি, উচ্চপর্যায়ের নীরব সমর্থন বা প্রশ্রয় ছাড়া এই চক্র এতটা সক্রিয় হতে পারতো না।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেড একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ৮ মার্চ ই-মেইলের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর ছাড়াই নিখোঁজ হন ওই কর্মকর্তা। পরবর্তীতে তার দায়িত্বকালীন সময়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তদন্ত শুরু করা হয়েছে এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন— বছরের পর বছর ধরে চলা এই কমিশন বাণিজ্যের দায় কি শুধুই একজন কর্মকর্তার ওপর বর্তাবে, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো সিন্ডিকেট।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শুধু জনসংযোগ বিভাগ নয়, আরও কয়েকটি বিভাগেও কমিশনভিত্তিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সরবরাহকারী ও ঠিকাদার নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের চর্চা চলার দাবি করা হয়েছে। এসব অনিয়মের প্রভাব পণ্যের মান ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যেখানে নিম্নমানের পণ্য নিয়ে ক্রেতাদের অসন্তোষও বাড়ছে।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য করুন