প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০৪:৪০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে কৃষক ইউসুফ আলী শেখকে (৫৫) কীটনাশক খাইয়ে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার চারজনকে নির্দোষ দাবি করেছে তাঁদের পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে নিখোঁজ আছমা বেগমকে (৫০) খুঁজে বের করার ঘটনায় ইউসুফ আলী শেখ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতেন। তাঁকে হত্যার পর আছমা বেগমের পরিবারের সদস্যদের পরিকল্পিতভাবে মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।
তবে পুলিশ বলছে, মৃত্যুর আগে ইউসুফ আলী শেখের দেওয়া কথিত ভিডিও বক্তব্যের সূত্র ধরেই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত এখনো চলমান এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
নিহত ইউসুফ আলী শেখ চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নের চরঅমরাপুর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের অভিযোগ, গত শনিবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যায় তাঁকে কৌশলে পদ্মার চরে ডেকে নিয়ে সাত থেকে আটজন মারধর করেন। একপর্যায়ে জোর করে তাঁর মুখে কীটনাশক ঢেলে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে স্থানীয় বশির মেম্বারের বাড়ির পাশে ফেলে রেখে যায় তারা।
স্বজনেরা গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ইউসুফকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে শনিবার রাতেই তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহতের পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে ইউসুফ আলী শেখ তাঁর ওপর নির্যাতন এবং জোর করে কীটনাশক খাওয়ানোর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ওই ভিডিওতে তিনি সাত থেকে আটজনের নামও উল্লেখ করেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ইউসুফ আলী শেখের স্ত্রী বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পরে সোমবার সকালে পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। মঙ্গলবার দুপুরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—চরভদ্রাসনের গাজীরটেক ইউনিয়নের চরঅমরাপুর গ্রামের সত্তার শেখের ছেলে শামীম হোসেন (২৫), মেয়ে ইয়াছমিন আক্তার (৩৪), পার্শ্ববর্তী ওকেল মাতুব্বরের ডাঙ্গী এলাকার আক্কাস মোল্যা (৬০) এবং তাঁর ছেলে জুলহাস মোল্যা (৩৫)।
গ্রেপ্তার ইয়াছমিন আক্তারের ছোট বোন পারুল আক্তার দাবি করেন, তাঁর ভাই শামীম ও বোন ইয়াছমিন এ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন।
তিনি বলেন, “বিষ প্রয়োগের পরের দিন রোববার দুপুরে জানতে পারি, কে বা কারা ইউসুফ শেখকে বিষ খাইয়েছে। এলাকার লোকজন আমার ভাই শামীম ও বোন ইয়াছমিনকে দায়ী করছেন। কিন্তু ঘটনার দিন আমরা সবাই বাড়িতেই ছিলাম। আমাদের বাড়িতে থাকা সিসি ক্যামেরায় এর প্রমাণ রয়েছে।”
পারুল আক্তার আরও বলেন, “আমাদের মা আছমা বেগম গত ৭ জুলাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই আমরা থানার সঙ্গে যোগাযোগ করছি। থানা থেকেই আমাদের জানানো হয়েছিল, ইউসুফ শেখের সঙ্গে মায়ের মুঠোফোনে যোগাযোগ হয়েছিল। এখন তাকেই বিষ খাইয়ে আমাদের ফাঁসানো হচ্ছে।”
তিনি জানান, বিষয়টি তাঁরা থানায় জানালে পুলিশ তাঁদের আশ্বস্ত করে যে তাঁরা জড়িত না থাকলে কোনো সমস্যা হবে না। পরদিন সকালে পুলিশ তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ইয়াছমিন ও শামীমকে আটক করে। পরে তাঁদের মামা আক্কাস মোল্যা ও তাঁর ছেলে জুলহাস মোল্যাকেও আটক করা হয়।
পারুলের ভাষ্য, “পরে জানতে পারি ইউসুফ শেখ মারা গেছেন এবং মৃত্যুর আগে নাকি আমার ভাই-বোনের নাম বলে গেছেন। কিন্তু তিনি যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার ভাই ও বোন নির্দোষ। তাঁদের ফাঁসানো হচ্ছে। আমরা ঘটনার সঠিক তদন্ত ও বিচার চাই।”
অভিযুক্ত ইয়াছমিন আক্তারের স্বামী আরিফ হোসাইনও তাঁর স্ত্রী ও শ্যালককে নির্দোষ দাবি করেছেন।তিনি বলেন, “মৃত্যুর আগে ইউসুফ শেখ যে ভিডিওটি করেছেন, সেখানে স্পষ্ট দেখা যায়, কেউ পেছন থেকে ইয়াছমিন ও শামীমের নাম শিখিয়ে দিচ্ছে।”
আরিফ হোসাইন আরও বলেন, “আমার শাশুড়ি এক মাস ধরে নিখোঁজ। এ কারণে পরিবারের সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। তাঁরা এমন কাজ কীভাবে করবেন? যে সময় ইউসুফকে বিষ খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে, সে সময় ইয়াছমিন ও শামীমসহ পরিবারের সদস্যরা বাড়িতেই ছিলেন। বাড়ির সিসি ক্যামেরায় এর প্রমাণ রয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমার শাশুড়ি কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন—এটা হয়তো ইউসুফ শেখ জানতেন। তিনি হয়তো বিষয়টি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। এ কারণেই দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করেছে বলে আমরা মনে করছি।”
ইউসুফ শেখ হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই এনামুল হক জানান, মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখনো পোস্টমর্টেম ও মেডিকেল রিপোর্ট পুলিশের হাতে পৌঁছেনি।
তিনি বলেন, “অভিযুক্তদের বাসা থেকে একটি সিসি ক্যামেরার ডিভিআর উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পাসওয়ার্ড না পাওয়ায় এখনো ভিডিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।”
হত্যার কোনো আলামত বা প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান।এসআই এনামুল হক বলেন, “মামলার তদন্ত শেষ হলে সবকিছু জানানো হবে।”
ইউসুফ শেখকে চায়ের দোকান থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে যে দাবি করা হয়েছে, তা নিয়ে হাজীগঞ্জ বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে।
হাজীগঞ্জ বাজারের চায়ের দোকানদার মমিন বলেন, “আমার দোকানে নিহত ইউসুফ আসেনি এবং তাকে কেউ ডাকেনি। অন্য কোনো দোকান হতে পারে।”
মুদি দোকানদার আলমগীর হোসেন বলেন, “আমার দোকান থেকেও ইউসুফ নামের কাউকে ডেকে নেওয়া হয়নি। তবে ইউসুফকে অসুস্থ অবস্থায় অটোরিকশায় করে নিয়ে যেতে দেখেছি।”
আরেক চায়ের দোকানদার খোরশেদ বলেন, “ঘটনার দিন ইউসুফ আমার দোকানে এসেছিল। তখন আমি দোকানে ছিলাম না, আমার স্ত্রী ছিল। তবে এখান থেকে কেউ ইউসুফকে ডেকে নেয়নি।”
হাজীগঞ্জ বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেন বলেন, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ইউসুফকে তাঁর দোকানের সামনে নিয়ে আসা হয়েছিল।তিনি বলেন, “তখন ইউসুফের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। আমার দোকানের সামনে তিনি সবুজ বর্ণের বমি করেন। তাঁর অবস্থা খারাপ দেখে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলি। তখন তাঁর সেন্স ছিল না। তাই তিনি কোনো কথা বলতে পারেননি।”
গত ৭ জুলাই আছমা বেগম (৫০) নিখোঁজ হন। তিনি চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নের চরঅমরাপুর গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে তাঁর পরিবার চরভদ্রাসন থানায় সাধারণ ডায়েরি করে।
পুলিশের তদন্তে আছমা বেগমের সঙ্গে ইউসুফ আলী শেখের মুঠোফোনে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ ইউসুফকে থানায় ডেকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে। বিষয়টি ফরিদপুর সার্কেল এসপির পর্যায়েও যায় এবং তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
আছমা বেগমের নিখোঁজের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোজাম্মেল বলেন, “আছমাকে খুঁজে বের করতে এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাঁর ব্যবহৃত সবগুলো নম্বর ট্র্যাক করে তদন্ত চলছে। তাঁর সঙ্গে যারা কথা বলতেন, তাঁদেরও নম্বর বন্ধ রয়েছে।”
ইউসুফ হত্যা ও আছমা নিখোঁজের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আছমাকে খুঁজে পেলেই আসল ঘটনা জানা যাবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় নেতা বলেন, “আছমা নিখোঁজের ব্যাপারে ইউসুফ জানত। এ জন্যই হয়তো তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তবে কে বা কারা মেরেছে, তা আমরা জানি না। আমরা চাই সত্যটা বেরিয়ে আসুক।”
আছমা বেগমের ছোট ছেলে প্রবাস থেকে দেশে ফিরে ফরিদপুর শহরে বসবাসরত তাঁর বড় বোন ইয়াছমিন আক্তারের বাসায় ওঠেন। কয়েক দিন পর পরিবারের সদস্যরা সদরপুরে ইয়াছমিনের স্বামীর বাড়িতে একটি মিলাদ অনুষ্ঠানে যান।
সেখান থেকে গত শনিবার (১ আগস্ট) তাঁরা সবাই মিলে তাঁদের পৈতৃক নিবাস গাজীরটেক ইউনিয়নের চরঅমরাপুরে যান। সেখানে আবারও আছমা বেগমকে খুঁজতে থাকেন তাঁরা। ওই রাতে দুই বোন, বড় ভাইয়ের স্ত্রী, সন্তান ও ছোট ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সেখানে অবস্থান করেন।
চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সফর আলী বলেন, “মৃত্যুর আগে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সূত্র ধরেই চারজনকে আটক করা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি।”
আছমা বেগমের নিখোঁজ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, “আছমা বেগম হারিয়ে যাননি। এর আগেও তিনি কয়েকবার এভাবে চলে গেছেন এবং পরে একাই ফিরে এসেছেন। এবার আসছেন না—এটাই ভাবার বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “ইউসুফের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। ইউসুফ মারা যাওয়ার আগে বলে গেছে, আছমা বেগমের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং সে তাঁর বিষয়ে জানত। তাঁকে হত্যার পেছনে এ বিষয়টি রয়েছে বলে আমরা মনে করছি।”
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের নির্দোষ দাবির বিষয়ে ওসি সফর আলী বলেন, “তদন্তে সবকিছুই বেরিয়ে আসবে।”
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ইউসুফ আলী শেখকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের দাবি, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে তাঁদের নির্দোষ স্বজনদের মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
একদিকে মৃত্যুর আগে ইউসুফের দেওয়া কথিত ভিডিও, অন্যদিকে অভিযুক্তদের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া কিন্তু পাসওয়ার্ডের কারণে এখনো খোলা সম্ভব না হওয়া সিসি ক্যামেরার ডিভিআর—দুটি বিষয়ই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে আছমা বেগমের নিখোঁজের ঘটনা এবং ইউসুফের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টিও রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
পুলিশ বলছে, পোস্টমর্টেম ও মেডিকেল রিপোর্টসহ তদন্তের অন্যান্য তথ্য হাতে পাওয়ার পর বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর দাবি, ইউসুফ আলী শেখের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি আছমা বেগমের সন্ধানও দ্রুত নিশ্চিত করা হোক।
মন্তব্য করুন