ড. আতাউর রহমান

প্রকাশিত: ১৫ আগষ্ট, ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

আরাফাত রহমান কোকো: এক অভিমানী নক্ষত্রের নীরব প্রয়াণ

পৃথিবীতে কিছু মানুষ আসেন, যারা ক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে জন্মগ্রহণ করেও ক্ষমতার মোহ থেকে নিজেদের সযত্নে আড়াল করে রাখেন। তারা আলোতে নয়, বরং নীরবে-নিভৃতে কাজ করে যেতে ভালোবাসেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী একটি পরিবারে—প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘরে জন্ম নিলেও আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ। তিনি কখনোই রাজনীতির জটিল সমীকরণে নিজেকে জড়াতে চাননি। তিনি ছিলেন এক নিভৃতচারী, বিনয়ী, শান্ত এবং অসম্ভব ক্রীড়াপ্রেমী একজন মানুষ। ব্যক্তিজীবনে সাদামাটা এই মানুষটির পুরোটা জীবন ছিল চরম বৈচিত্র্যময়, বেদনাবিধুর এবং গভীর আবেগে মোড়ানো। অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তিনি আজও বেঁচে আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়।

১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট এক শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার জন্মের পর বাবা জিয়াউর রহমান পবিত্র হজের স্মৃতিবিজড়িত আরাফাত ময়দানের নামানুসারে আদরের ছোট ছেলের নাম রাখেন ‘আরাফাত রহমান’। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাবার এক গভীর আবেগ ও আধ্যাত্মিক ভালোবাসা। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান আরাফার সেই তপ্ত ময়দানে হাজিদের কষ্ট লাঘবের জন্য প্রচুর নিমগাছ রোপণ করেছিলেন। আরবরা ভালোবেসে আজও সেই গাছগুলোর নাম দিয়েছে ‘জিয়া ট্রি’। পরিবারের সবার কাছে তিনি ছিলেন নয়নের মণি। বাসায় তাকে আদর করে ডাকা হতো ‘কোকো’ বা ‘দোদো’ নামে। জিয়াউর রহমানের ভীষণ প্রিয় ছিল এই লাজুক স্বভাবের ছোট ছেলেটি। আর মা বেগম খালেদা জিয়ার কাছে তিনি ছিলেন আদরের ছোট মানিক। বাবার মতোই শ্যামবরণ গায়ের রঙ পেয়েছিলেন তিনি, আর পেয়েছিলেন এক গভীর মায়াময় চোখের চাহনি, যা দিয়ে খুব সহজেই মানুষের মন জয় করে নেওয়া যেত। ১৯৭১ সালের উত্তাল সময়। বাবা জিয়াউর রহমান তখন মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সম্মুখ সমরে। এদিকে যুদ্ধের সেই ভয়াল ডামাডোলের মধ্যে বড়ভাই পিনো (তারেক রহমান) আর মায়ের সঙ্গে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন ছোট্ট কোকো। সেই বন্দিদশায় একদিন ঘটে যায় এক অলৌকিক ঘটনা। ছোট্ট কোকো সেদিন একটু দূরে আপন মনে খেলা করছিলেন, আর বড়ভাই তারেক রহমান বসে ছিলেন মায়ের পাশে। হঠাৎ মায়ের মনে কী এক অজানা শঙ্কা জেগে ওঠে। মাতৃত্বের এক অদ্ভুত ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে তিনি ছুটে গিয়ে ছোট ছেলেকে কোলে তুলে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে আসেন। আর ঠিক পরমুহূর্তেই ঘটে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ! একটা ভারী মর্টার শেলের আঘাতে হুড়মুড় করে ছাদ ভেঙে ধসে পড়ে ঠিক সেই জায়গাটায়, যেখানে কয়েক সেকেন্ড আগেও কোকো খেলছিলেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে আর মায়ের পরম মমতায় সেদিনকার মতো অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

ছোটবেলায় কোকো ছিলেন অত্যন্ত দুরন্ত এবং চঞ্চল প্রকৃতির। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ‘সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান’ সিরিজ দেখে তিনি নিজেকেও সেই চরিত্রের মতো শক্তিশালী ভাবতেন। তার শিশুমন কল্পনা করত, তিনি হয়তো রকেটে চড়ে অন্য কোনো গ্রহ থেকে এই পৃথিবীতে এসেছেন! এই দুরন্তপনার কারণে একবার সিঁড়ির ওপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে নিজের পা ভেঙে বসেন। এরপর তাকে নিয়ে হাসপাতালে ডাক্তারদের কাছে দৌড়াদৌড়ি, সে এক এলাহি কাণ্ড! ছোটবেলায় প্রায়ই তিনি খাট থেকে মেঝেতে পড়ে যেতেন। সে সময় তাদের ঘরের মেঝেতে কোনো কার্পেট ছিল না। শক্ত মেঝেতে বারবার পড়ে গিয়ে তার মাথাটা নাকি বেশ শক্ত হয়ে গিয়েছিল। কখনো কখনো আবার নিজের ছোট্ট পা দিয়ে চলমান গাড়ি আটকানোর মতো ছেলেমানুষি চেষ্টাও করতেন। আর সারাদিন মেতে থাকতেন ক্রিকেট খেলায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বয়স বাড়ার পালায় তার এই দুরন্তপনা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। বড় হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন পরিবারের সবচেয়ে শান্ত, ধীরস্থির এবং লাজুক এক যুবক।

আরাফাত রহমান কোকোর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল ঢাকার বিখ্যাত শহীদ আনোয়ার স্কুলে। এরপর বড়ভাই তারেক রহমানের সঙ্গে তিনি রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৮১ সালে বাবা জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তার মা বেগম খালেদা জিয়া যখন শোক সামলে জাতীয়তাবাদী দলের হাল ধরেন, তখন নিরাপত্তার কথা ভেবে ছেলেকে পাঠিয়ে দেন চাচার কাছে সুদূর যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাজ্য থেকেই তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ‘ও লেভেল’ শেষ করে পাড়ি জমান আমেরিকায়। সেখানে ‘এ লেভেল’ শেষ করার পর তিনি অস্ট্রেলিয়া চলে যান এবং সিভিল এভিয়েশনে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। অনেকেই হয়তো জানেন না, আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন একজন সুদক্ষ রেজিস্টার্ড পাইলট। কিন্তু মা বেগম খালেদা জিয়া ছেলেকে হারানোর ভয় পেতেন বলে মায়ের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তার আর পেশাদার পাইলট হিসেবে আকাশে ওড়া হয়নি। এরপর তিনি ফিরে আসেন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে, মায়ের স্নেহময় কোলে। উড়োজাহাজ চালাতে না পারলেও দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর প্রতি তার ছিল এক প্রবল ঝোঁক। মনে হতো, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসেই তিনি যেন উড়োজাহাজকে হারিয়ে দিতে চাইতেন!

লেদার জ্যাকেট আর সানগ্লাস পরা আধুনিক স্মার্ট এই যুবকটিকে দেখলে অনেকেই হয়তো বুঝতে পারতেন না যে তিনি কতটা ধর্মপ্রাণ ছিলেন। বুঝতে শেখার পর থেকে তিনি কোনো দিন রোজা ছাড়েননি এবং নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বড় হলেও তিনি ধর্মীয় রীতিবিরুদ্ধ বলে নিজের জন্মদিনের কেক কাটতে পর্যন্ত চাইতেন না। বাবার মতোই অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতে ভালোবাসতেন তিনি। আহার করতেন খুব অল্প পরিমাণে। হৈ-হুল্লোড়, জোরে মিউজিক বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ তার একদমই পছন্দ ছিল না। তিনি ছিলেন নিরিবিলি জীবনের পূজারি। একবার ভাবিদের জোরাজুরিতে একটি কনসার্টে গিয়ে কিছুক্ষণ পরই তিনি রেগেমেগে বলেছিলেন, "আমাকে এ কোথায় নিয়ে এলেন!" শেষে বিরক্ত হয়ে নিজের মোবাইলে গেম খেলেই সময় কাটিয়েছিলেন। তবে ভাবিদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আদরের ছোটভাই, যিনি সবসময় সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি এবং দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে ছিল তার সুখের সংসার। তিনি ছিলেন একজন প্রাণপ্রিয় স্বামী ও দুই কন্যার গর্বিত বাবা।

নিজে রাজনীতিতে না জড়ালেও খেলাধুলার প্রতি তার ছিল এক তীব্র টান। নিজে ক্রিকেটপাগল হলেও ফুটবলে তার প্রিয় দল ছিল ব্রাজিল। বিশ্বকাপ এলে প্রবল উৎসাহে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ব্রাজিলের খেলা উপভোগ করতেন। তবে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে ক্রিকেটে তার অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ‘ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান’ থাকাকালীন তিনি দেশের ক্রিকেটকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। তার দক্ষ, সৎ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাংলাদেশের ক্রিকেট আন্তর্জাতিক পরিসরে এক মজবুত ভিত্তি পেয়েছিল। আরাফাত রহমান কোকোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই বিকেএসপি থেকে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি করার প্রক্রিয়া বেগবান হয়। আজকের দিনের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল কিংবা মুশফিকুর রহিমরা তার হাতেই গড়া রত্ন। তিনি ওল্ড ডিওএইচএস ক্লাবের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। শুধু তাই নয়, তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর উদ্যোগেই বগুড়ায় নির্মাণ করা হয় আন্তর্জাতিক মানের ‘শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম’। এই স্টেডিয়ামটি নিয়ে বগুড়াবাসী যেমন আজও গর্ববোধ করে, ঠিক তেমনি আরাফাত রহমান কোকোর স্থানও হয়েছে তাদের হৃদয়ের একদম মণিকোঠায়।

যে মানুষটির কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল না, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকেই হতে হয় নোংরা রাজনীতির নির্মম বলি। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জড়ানো হয় একের পর এক ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায়। তাকে যখন বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনো সেই নির্ভীক কোকো অত্যন্ত ভরাট ও শান্ত কণ্ঠে অফিসারদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আমাকে নিতে এসেছেন? কোথায় যেতে হবে? চলেন..." কিন্তু গাড়িতে তোলার পরপরই তার সঙ্গে শুরু হয় পাশবিক আচরণ। তার হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হয় এবং কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। রিমান্ডের নামে তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দুই ভাইকে একই জেলখানার আলাদা ব্লকে এমনভাবে রাখা হয়, যেন তাদের একবারের জন্যও সাক্ষাৎ না হয়। যে টগবগে তরুণ কোকোকে নিজের পায়ে হাঁটিয়ে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ২০০৮ সালে সেই একই কোকোকে জেল থেকে বের করা হয় পঙ্গু অবস্থায়, একটি হুইলচেয়ারে করে।

দেশ ছাড়ার পর চিকিৎসার জন্য তাকে পাড়ি জমাতে হয় বিদেশে। মালয়েশিয়ার নির্বাসিত জীবনে বড্ড অভিমানী এই মানুষটি ফটোগ্রাফিকেই নিজের একমাত্র সঙ্গী করে নিয়েছিলেন। খুব ভালো ছবি তুলতেন তিনি। প্রকৃতির অসাধারণ সব ছবি যে কাউকে বিমোহিত করার মতো। বন্দিজীবনের সেই অসহ্য অপমানের কষ্ট তিনি কিছুতেই ভুলতে পারেননি। কোনো অপরাধ না করেও মিথ্যা অভিযোগের যে ভারী বোঝা তার ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল, তা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। অত্যন্ত নিঃসঙ্গ ও নিভৃত এক জীবন কাটিয়েছেন তিনি প্রবাসে। এই মানসিক যন্ত্রণা আর শারীরিক অসুস্থতা তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

অবশেষে ২০১৫ সালে এক অকালমৃত্যু এসে কেড়ে নেয় কোটি মানুষের এই প্রিয় মুখটিকে। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছিলেন, পড়াশোনার জন্য দীর্ঘদিন থেকেছেন বিদেশে, আর সবশেষ রাজনীতির বলি হয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রাণপ্রিয় মা এবং বড়ভাইয়ের স্নেহ থেকে তাকে বঞ্চিত রাখা হয়। তার এই অকালপ্রয়াণ দেশের প্রতিটি হৃদয়বান মানুষের মনকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। মালয়েশিয়া থেকে তার কফিন যখন দেশে পৌঁছায়, তখন তার জানাজায় শরিক হতে সাধারণ মানুষের এক অভাবনীয় ঢল নামে। যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো প্রতিটি জনস্রোতের লক্ষ্যস্থল ছিল একটাই—বায়তুল মোকাররম মসজিদ। এই বিশাল জনসমুদ্রের প্রতিটি মানুষের চোখের জল আর হৃদয়ের দোয়া ছিল কেবল আরাফাত রহমান কোকোর জন্য। এই জনসমুদ্রের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সহমর্মিতা ছিল জিয়া পরিবারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক।

জীবদ্দশায় তিনি হয়তো মা ও ভাইয়ের স্নেহ থেকে দূরে ছিলেন, কিন্তু মৃত্যুর পর দেশের কোটি মানুষের হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা প্রমাণ করে দিয়েছে—আসলে তিনি কারও ভালোবাসা থেকে বিন্দুমাত্র বঞ্চিত হননি। তিনি রাজনীতি করেননি, কাউকে আক্রমণ করে কথা বলেননি, শুধু নীরবে দেশের ক্রিকেটের জন্য কাজ করে গেছেন। আর সে কারণেই একরাশ অভিমান নিয়ে বিদায় নেওয়া এই নিভৃতচারী মানুষটি আজও পরম শ্রদ্ধায় বেঁচে আছেন লাখো কোটি বাঙালির হৃদয়ের গভীরে।

লেখক

ড. মো. আতাউর রহমান
সাংগঠনিক সম্পাদক 
বাংলাদেশ প্রেসক্লাব ইউকে
লেকচারার: এসেক্স বিজনেস স্কুল

মন্তব্য করুন