প্রকাশিত: ১৮ মে, ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
আইনিভাবে মাত্র পাঁচ বছর অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দিয়ে বৈশ্বিক সূচকের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই অঞ্চলের ও সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলো যেখানে দীর্ঘ মেয়াদি বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ কেবল পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এই সুবিধা সীমাবদ্ধ রেখেছে। গবেষকদের মতে, এই ব্যবধানের কারণ সুস্পষ্ট হলেও সমাধানে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা অনুপস্থিত।
ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকস ও এডুকেশন ডাটা অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স কমিশনের তৈরি এই প্রতিবেদনে প্রতিটি দেশের ‘ইয়ার্স অফ গ্যারান্টিড এডুকেশন প্রোগ্রাম’ (ওয়াইজিইপি) পরিমাপ করা হয়েছে, যা প্রকাশ করে সরকার কত বছর অবৈতনিক শিক্ষা দিতে বাধ্য। বাংলাদেশে এই সময়সীমা মাত্র পাঁচ বছর। এই অবস্থান তাকে বিশ্বের তলানিতে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তার সঙ্গী পশ্চিম আফ্রিকার টোগো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার ও ভিয়েতনাম। তালিকার শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়া, মরিশাসের মতো দেশগুলো ১৩ বছরের অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।
দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরেই ব্যবধান প্রকট। শ্রীলঙ্কা ১৩ বছর, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল ১২ বছর করে, ভুটান ১১ বছর এবং ভারতও ৮ বছর অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে। কেবল বাংলাদেশই পঞ্চম শ্রেণিতে আটকে আছে। ২০১০ সালে পাস হওয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হলেও দীর্ঘ ১৫ বছর পরও তা কাগজেই সীমাবদ্ধ।
এই স্থবিরতার জন্য সরাসরি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, ‘সরকারের কাছে শিক্ষা কখনোই প্রকৃত অগ্রাধিকার পায়নি। তারা কেবল বাধ্যবাধকতা থেকে কাজ করে, সঠিক বাস্তবায়নের সদিচ্ছা থেকে নয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, মেয়াদ বাড়ানো শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর জন্য দরকার আর্থিক বরাদ্দ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ভৌত অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা এখনো গড়ে ওঠেনি।
‘নামমাত্র অবৈতনিক, বাস্তবে নয়’—এই বাস্তবতাই তুলে ধরেন আইইআরের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কাগজে-কলমে বা সরকারিভাবে আমরা হয়তো এটাকে অবৈতনিক বলতে পারি, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এমনকি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাও পুরোপুরি অবৈতনিক নয়। কারণ শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হলে শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি তাদের দুপুরের খাবারের দায়িত্বও নিতে হবে।’ পরিবারগুলোর ওপর খাতা, কলম, যাতায়াত ও প্রাইভেট কোচিংয়ের খরচের চাপের পাশাপাশি তিনি ‘সুযোগ ব্যয়’-এর ধারণাটি সামনে আনেন। তাঁর ভাষ্য, ‘একটি শিশু যদি স্কুলে না যেত, তবে হয়তো সে কোনো চায়ের দোকানে বা কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে টাকা আয় করত। সেই হারিয়ে যাওয়া আয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমি শিশুটিকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে আসতে বাধ্য করছি। অথচ পরিবারের সেই আয়ের প্রয়োজন ছিল।’
এই কাঠামোগত সংকটের মূলে শিক্ষার নিম্নমান ও শিক্ষকতার প্রতি অনীহাকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ড. মনিনুর রশিদ সতর্ক করে বলেন, ‘ভিত্তি যদি শুরু থেকেই দুর্বল হয়, তবে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরেই সেই দুর্বলতা বয়ে বেড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে প্রায় ৯০% আবেদনকারী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন।’
শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘দেশের সেরা মেধাবীরা কেন শিক্ষকতায় আসবেন না? কারণ আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা বা প্রণোদনা দিই না। অনেকেই পছন্দের পেশা হিসেবে না, ভাগ্য চক্রে শিক্ষক হন। কেউ যদি অনিচ্ছাকৃত শিক্ষকতায় আসেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই তার কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা থাকবে না।’
বাজেট বাড়ানোর বদলে সঠিক খাতে ব্যয়ের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি বাজেট বাড়াইও, কিন্তু সেখানে যদি বিদ্যুৎ বা ওয়াই-ফাই না থাকে, তবে স্মার্ট ডিভাইস কিনে কী লাভ? আসল প্রশ্ন হলো, আমরা সঠিক জায়গায় টাকা খরচ করছি কি না।’
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সংখ্যা নয়, মানই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। ড. মনিনুর রশিদ বলেন, ‘আমাদের প্রথমে বর্তমান স্তরের শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি স্তরেই যেন সঠিক শিক্ষণ ফল অর্জিত হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।’ অধ্যাপক মজিবুর রহমান আবার ফিরিয়ে আনেন মূল প্রশ্নটি—‘আমরা কি কেবল শ্রমিক বা চাকর তৈরি করতে চাই? নাকি নেতৃত্ব তৈরি করতে চাই? শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের আগে খুঁজতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই সামগ্রিকভাবে এবং আন্তরিকতার সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেনি।’ ইউনেস্কোর প্রতিবেদন এই বাস্তবতাকে আবারও দৃশ্যমান করল; এখন পদক্ষেপ নেওয়া সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
মন্তব্য করুন