নাজমুল হুদা

প্রকাশিত: ৮ জুন, ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

খুলনায় সন্ত্রাস দমনে যৌথ অভিযানে আরও ৩৩ জন গ্রেপ্তার, পাঁচ দিনে ২৯১ জন

ছবি: সংগৃহীত

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার দমনে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ সোমবার সকাল পর্যন্ত আরও ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। রোববার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। গত পাঁচ দিনে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে মোট ২৯১ জনকে আটক করা হয়েছে, তবে শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীদের অনেকেই এখনো কর্তৃপক্ষের হাতের মুঠোয় আসেননি।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিস্তৃত বিশ্লেষণ

সোমবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রেরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে নগরের বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা বিভাগ সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করেছে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে খুলনা থানা থেকে ৯ জন, সোনাডাঙ্গা মডেল থানা থেকে ১০ জন, লবণচরা থানা থেকে ৪ জন, খালিশপুর থানা থেকে ৩ জন, দৌলতপুর থানা থেকে ২ জন এবং খানজাহান আলী থানা থেকে ৩ জন রয়েছেন। গোয়েন্দা পুলিশের আলাদা অভিযানে ২ জন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০৪টি ইয়াবা ট্যাবলেট এবং ৯ প্যাকেট গাঁজা জব্দ করা হয়েছে।

চিহ্নিত সন্ত্রাসী সজল আকনের গ্রেপ্তার

সোমবার রাতে শহরের লবণচরা থানার স্লুইসগেট এলাকায় বিশেষ অভিযানে দ্রুত কর্মবাহিনী (র‍্যাব) তার ছয়ের স্পেশাল কোম্পানি সজল আকনকে গ্রেপ্তার করেছে। সজল আকন, যিনি 'বি-কোম্পানি'র সদস্য হিসেবে পরিচিত, গতানুগতিক সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত। তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিশেষ ক্ষমতা আইন, চুরি ও মারপিট সংক্রান্ত অভিযোগে খুলনার বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

অব্যাহত অভিযান এবং তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীর গ্রেপ্তার

যৌথ অভিযানের ক্রমাগত কার্যক্রমে গত মঙ্গলবার রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর সমীপবর্তী সহযোগী রাব্বি সহ চারজনকে আটক করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের স্বাধীন অভিযানে ৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের বিভিন্ন অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টতা ছিল। সেই অভিযানে একটি দেশীয় বন্দুক নিষ্কাশন করা হয় এবং ১১টি মোটরসাইকেল ও একটি পিকআপ গাড়ি আটক করা হয়।

শুক্রবার গ্রেনেড বাবুর সহযোগী হিসেবে পরিচিত কসাই লিটন ও রিফাত সহ ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার ৬২ জন এবং রোববার আরও ৭৪ জনকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে পলাশ গ্রুপের নেতা শেখ পলাশ ওরফে চিংড়ি পলাশের সহযোগী এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসী কাজী রাফসান মাহমুদ ওরফে পার্থ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

শক্তিশালী হয়ে ওঠা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল তত্ত্বাবধান এবং নিষ্ক্রিয়তার সুবাদে বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। খুলনা মহানগর এবং জেলা জুড়ে বর্তমানে নয়টি সন্ত্রাসী সংগঠন উল্লেখযোগ্য হিসেবে পরিচিত। এগুলো হল রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন বি-কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ। এর মধ্যে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন বি-কোম্পানির বিরুদ্ধে সর্বাধিক অভিযোগ রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশ জানিয়েছে যে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি তারা নতুন চারটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেছে। বিভিন্ন ফাঁড়িতে কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং একাধিক এলাকায় চব্বিশ ঘণ্টা টহল কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। গত কয়েক দিনের অভিযানে তালিকাভুক্ত চারজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন মামলার আসামি, মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী এবং চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত।

হত্যাকাণ্ডের গুরুতর পরিসংখ্যান

পুলিশের প্রদত্ত তথ্য অনুসারে চলমান বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে খুলনা নগরে ১৬টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সম্প্রতি সংঘটিত জাতীয় গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সাথে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের জড়িততা উন্মোচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি শহরে নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন করে আলোচনা ও পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

মন্তব্য করুন