প্রকাশিত: ৬ জুন, ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ঢাকার বাসিন্দা ও পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী তানভীর হোসেন গত মে মাসে একটি প্রতারণামূলক ফোনকলের শিকার হয়ে মুহূর্তের মধ্যে নিজের মোবাইল আর্থিক হিসাব থেকে ৫০ হাজার টাকা হারিয়েছেন। কথিত ‘বিকাশ গ্রাহক সেবা’ কেন্দ্র থেকে আসা একটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ও পেশাদার কণ্ঠস্বরের ফাঁদে পড়ে তিনি নিজের ফোনে আসা ‘এককালীন নিরাপত্তা কোড’ (ওটিপি) প্রকাশ করে ফেলেন। দেশের সাইবার অপরাধ তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নিত্যনতুন কৌশলের কারণে এই ধরনের আর্থিক জালিয়াতি দেশজুড়ে চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানান, ‘এককালীন নিরাপত্তা কোড’ হলো একটি অস্থায়ী ছয় সংখ্যার বিশেষ গোপন নম্বর, যা ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং বা যেকোনো সংবেদনশীল ডিজিটাল কার্যক্রমের সময় গ্রাহকের নিবন্ধিত মোবাইল ফোনে পাঠানো হয়। এটি কেবল একবার ব্যবহারের জন্য এবং অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য কার্যকর থাকে। এই কোডটি গ্রাহকের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করে বিধায় আর্থিক অপরাধী ও প্রতারকদের কাছে এটি অত্যন্ত মূল্যবান একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের সাইবার অপরাধ তদন্তকারীদের মতে, এই জালিয়াতি চক্রের কৌশল এখন অনেক বেশি আধুনিক ও সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছে। অপরাধীরা কেবল সাধারণ ফোনকলেই সীমাবদ্ধ না থেকে একাধিক উপায়ে গ্রাহকদের ওপর পদ্ধতিগত আক্রমণ চালাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি কৌশল হলো:
কণ্ঠভিত্তিক প্রতারণা: ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সেজে জরুরি সমস্যার অজুহাতে গ্রাহকদের আতঙ্কিত করে এই গোপন কোড হাতিয়ে নেওয়া।
ভুয়া খুদে বার্তার লিংক: ব্যাংক বা বৈধ প্রতিষ্ঠানের মতো হুবহু নকল ও ভুয়া ওয়েবসাইটের ঠিকানা পাঠিয়ে ব্যবহারকারীর সংবেদনশীল তথ্য চুরি করা।
সিম প্রতিস্থাপন: গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ করে মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে ভুক্তভোগীর নম্বরের একটি নতুন সিম তুলে নেওয়া।
মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ: লটারি বা পুরস্কার জেতার লোভ দেখিয়ে কিংবা পরিচিত কোনো মানুষের বিপদের কথা বলে দ্রুত বিশ্বাস অর্জন করা।
এই অপরাধের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিকটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রতারকেরা এখন এই প্রযুক্তির সাহায্যে ভুক্তভোগীর পরিচিতজন বা আত্মীয়-স্বজনের কণ্ঠস্বর হুবহু নকল (ভয়েস ক্লোনিং) করে কথা বলছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অডিও নমুনা থেকে যেকোনো মানুষের কণ্ঠ তৈরি করার এই প্রযুক্তির কারণে গ্রাহকেরা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং ভাবছেন তাদের আপনজনই হয়তো কোনো চরম বিপদে পড়েছেন।
এই ধরনের ভয়াবহ জালিয়াতি থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে রক্ষা করতে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু অতি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছেন:
১. কোনো অবস্থাতেই নিজের এককালীন নিরাপত্তা কোড কাউকে বলা যাবে না; কারণ কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনোই গ্রাহকের কাছে এই কোড জানতে চায় না। ২. অপরিচিত নম্বর থেকে আসা কলে অতি উৎসাহী হয়ে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। ৩. যেকোনো খুদে বার্তায় আসা লিংকে ক্লিক করার আগে ওয়েবসাইটের ঠিকানা খুব ভালো করে যাচাই করতে হবে। ৪. মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ্লিকেশনে দৈনিক লেনদেনের সীমা সুনির্দিষ্ট করে রাখতে হবে। ৫. কোনো সন্দেহজনক কল বা বার্তা পেলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক বা অফিশিয়াল নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। ৬. পরিবারের প্রবীণ ও প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ সদস্যদের এই বিষয়ে প্রতিনিয়ত সচেতন করতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং পুলিশের সাইবার অপরাধ তদন্ত শাখা সম্মিলিতভাবে এই অপরাধ দমনে ব্যাপক প্রচারণা ও অভিযান চালাচ্ছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল কারিগরি বা প্রযুক্তিগত প্রতিরোধই এই সংকট সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়; এই আধুনিক ডিজিটাল যুদ্ধ জয়ে সর্বস্তরের মানুষের ব্যক্তিগত সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
মন্তব্য করুন