তরুণ কণ্ঠ অনলাইন

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:৩৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

দক্ষিণ কোরিয়ার ‘গোল্ডেন পেন অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন মুম রহমান

মুম রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্য ও কবিতার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্ত হলো নতুন এক গৌরবের অধ্যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মাননা ‘KAOWL & CNPN Golden Pen Award’ পেয়েছেন বাংলাদেশের কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও শিল্প সমালোচক মুম রহমান। তিনি এ পুরস্কারের ১৮তম প্রাপক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোরিয়া থেকে বাংলা ভাষার কোনো কবির আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার অর্জনের ক্ষেত্রে এটি প্রথম ঘটনা। ফলে মুম রহমানের এই অর্জন একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যিক সাফল্য এবং বাংলা ভাষার সাহিত্যচর্চার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কোরিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ওয়ার্ল্ড লিটারেচার (KAOWL) এবং Culture & People Newspaper (CNPN) যৌথভাবে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও কবিতায় উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার প্রদান করে থাকে। পুরস্কারটির জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান কবি ড. কাং বিয়ং-চিওল (Dr. Kang Byeong-Cheol) স্বাক্ষরিত এক আনুষ্ঠানিক পত্রে মুম রহমানের নির্বাচনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। গত ১০ আগস্ট ২০২৬ CNPN News-এর মাধ্যমে পুরস্কারপ্রাপ্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রকাশ করা হয়েছে।
মুম রহমানকে এবারের পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত তুরস্কের কবি তারিক গুনারসেল (Tarık Günersel)। পুরস্কার কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক চিঠিতে তাঁর মনোনয়ন এবং মুম রহমানের সাহিত্যিক অর্জনের প্রতি তাঁর আস্থা ও সমর্থনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে মুম রহমানের দীর্ঘদিনের বাংলা সাহিত্য নিয়ে নানাবিধ সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড, বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে নতুন এই অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্য এবং বাংলাদেশের কবি-
‘KAOWL & CNPN Golden Pen Award’-এর পূর্ববর্তী প্রাপকদের তালিকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মালয়েশিয়ার মাওয়ার মারজুকি, মিসরের জর্জ ওন্সি, আলবেনিয়া/ইতালির ইরমা কুর্তি, উত্তর মেসিডোনিয়ার কাটিকা কুলাভকোভা, সার্বিয়ার ডুসান গোজকভ, ইতালির লিডিয়া চিয়ারেলি, কোরিয়ার সিয়ং ডুং, বেলজিয়াম/স্পেনের জার্মেইন ড্রুজেনব্রুডট, তুরস্কের তারিক গুনারসেল, চীনের কাও শুই, গ্রিসের দিমিত্রিস পি. ক্রানিওটিস, সার্বিয়ার মাজা হারমান-সেকুলিক এবং কিরগিজস্তানের রহিম করিমসহ বিভিন্ন দেশের কবি-সাহিত্যিক উল্লেখযোগ্য।
এই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবার বাংলাদেশের বাংলা ভাষার একজন কবির অন্তর্ভুক্তি বাংলা কবিতার বৈশ্বিক যাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে বাংলা ভাষার কবিতা যে বিশ্বের অন্যান্য ভাষার কবিতার সঙ্গে সমানতালে সাহিত্যিক সংলাপ তৈরি করতে সক্ষম—মুম রহমানের এই অর্জন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় মুম রহমান বলেন, ‘এই সম্মান আমার জন্য গভীর আনন্দ ও একই সঙ্গে বড় দায়িত্বের। আমি এটিকে শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখি না; বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিনিধিত্ব করার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখি।’
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার কবিদের সঙ্গে বাংলা কবিতার যে চিরন্তন সংলাপ, এই স্বীকৃতি সেই সংলাপকে আরও গভীর করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, কোরিয়া থেকে বাংলা ভাষার কোনো কবির জন্য এই প্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার অর্জনের ঘটনা তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলা ভাষার সাহিত্য যে বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরের অংশ, এই স্বীকৃতি তারই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।

ত্রিভাষিক প্রকাশনায় বাংলা কবিতা-
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুম রহমানের সাহিত্যচর্চার পরিচিতি এরইমধ্যে আরও বিস্তৃত হয়েছে। কোরিয়ার CNPN পত্রিকায় তাঁর একাধিক কবিতা বাংলা, ইংরেজি ও কোরিয়ান—এই তিন ভাষায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলা কবিতার ভাব, ভাষা ও নন্দনতত্ত্বকে অন্য ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ত্রিভাষিক প্রকাশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুবাদের মাধ্যমে একটি ভাষার সাহিত্য যখন অন্য ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছায়, তখন তা শুধু একজন লেখকের পরিচিতিই তৈরি করে না; বরং সংশ্লিষ্ট ভাষা ও সংস্কৃতিকেও বিশ্বসাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করে। সেই বিবেচনায় মুম রহমানের কবিতার ত্রিভাষিক প্রকাশনা এবং ‘Golden Pen Award’ প্রাপ্তি একই ধারার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

বহুমাত্রিক সাহিত্যচর্চায় মুম রহমান-
মুম রহমানের পুরো নাম মুহম্মদ মজিবুর রহমান। জন্ম ২৭ মার্চ ১৯৭১। কবিতা, কথাসাহিত্য, অনুবাদ, নাটক ও প্রবন্ধসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর দীর্ঘদিনের বিচরণ। দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পত্র-পত্রিকায় তাঁর অসংখ্য গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয় তাঁর রচিত ও অভিনীত প্রথম টেলিভিশন নাটক ‘এক চিলতে আকাশ’। পরবর্তী সময়ে মঞ্চ ও বেতারেও কাজ করেছেন তিনি। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে নাট্য রচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পত্র-পত্রিকা ও বিজ্ঞাপনী সংস্থায়ও কর্মরত ছিলেন। পেশাজীবনে নাট্যশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সকল পেশা ত্যাগ করে  বর্তমানে পূর্ণকালীন লেখক। খণ্ডকালীন তথ্যচিত্র নির্মাতা মুম রহমান। 
উপন্যাস, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদ—সব মিলিয়ে মুম রহমানের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬৪টি। দীর্ঘদিনের এই বহুমাত্রিক সাহিত্যচর্চাই তাঁকে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে নতুন সম্ভাবনা-
সাহিত্য পুরস্কার কেবল একজন লেখকের ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি নয়; অনেক সময় তা একটি ভাষা ও সংস্কৃতির বৈশ্বিক পরিচিতিরও বাহক হয়ে ওঠে। মুম রহমানের ‘KAOWL & CNPN Golden Pen Award’ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কোরিয়া থেকে বাংলা ভাষার কোনো কবির জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মাননা হিসেবে এই অর্জন বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিক যাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে থাকল।
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার কবিদের সঙ্গে বাংলা কবিতার যোগাযোগ, অনুবাদ এবং পারস্পরিক সাহিত্য বিনিময়ের যে ক্ষেত্রটি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, মুম রহমানের এই স্বীকৃতি সেই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সাহিত্যাঙ্গনের।

মন্তব্য করুন