প্রকাশিত: ৫ জুন, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নকশা করা এক নতুন ধরনের ভ্যাকসিন করোনাভাইরাসের বিভিন্ন প্রকার ও ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, এই প্রথম কোনো ভ্যাকসিনের মূল উপাদান বা অ্যান্টিজেন সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নকশা করা হয়েছে এবং সেটি মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বিভিন্ন করোনাভাইরাসের জিনগত তথ্য সংগ্রহ করেন। আন্তর্জাতিক নজরদারি কর্মসূচির মাধ্যমে পাওয়া এসব তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থায় বিশ্লেষণ করে একটি ‘সুপার–অ্যান্টিজেন’ তৈরি করা হয়। এই অ্যান্টিজেন রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পুরো ভাইরাস পরিবারকে শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম বলে দাবি গবেষকদের। ভ্যাকসিনটির প্রথম ধাপের পরীক্ষায় ৩৯ জন অংশ নেন। বর্তমানে প্রায় ২০০ জনকে নিয়ে দ্বিতীয় ধাপের গবেষণা চলছে।
গবেষণা দলের সদস্য অধ্যাপক জোনাথন হিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় ভাইরাসের পেছনে ছুটছি। আমাদের লক্ষ্য হলো পরিস্থিতির আগেই প্রস্তুত থাকা।’ তার মতে, এই প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে নতুন কোনো প্রাদুর্ভাব বা মহামারি শুরু হওয়ার আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি থাকবে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে বিদ্যমান কোনো ভাইরাসের ধরন বিশ্লেষণ করে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। কিন্তু অনেক ভাইরাস দ্রুত মিউটেশন ঘটাতে সক্ষম হওয়ায় প্রচলিত ভ্যাকসিন অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যকারিতা হারায়। ক্যামব্রিজের গবেষকদের তৈরি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পদ্ধতিতে ভাইরাস রূপ পরিবর্তন করলেও বা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে নতুন সংক্রমণ ছড়ালেও সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অধ্যাপক হিনি বলেন, ‘এআই-নকশা করা কোনো অ্যান্টিজেন এই প্রথম মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানবকল্যাণে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা সত্যিই বিস্ময়কর।’ তার ভাষায়, ‘এটি শুধু আজকের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যতের প্রাদুর্ভাব ও নতুন রোগের বিরুদ্ধে আগাম প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। মহামারির প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন।’
গবেষণার ফলাফল জার্নাল অব ইনফেকশন–এ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব আপাতত ‘মধ্যম মাত্রার’ হলেও গবেষণাটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। গবেষণার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে যুক্ত সাউথ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সল ফস্ট বলেন, ‘এই এআইভিত্তিক নকশার মধ্যে অবশ্যই সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর।’ তার মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভাইরাসের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য মহামারির জন্য ভ্যাকসিন নকশা তৈরিতে এই প্রযুক্তি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
যদিও গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, কেমব্রিজের গবেষকরা ইতোমধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলা মোকাবিলার জন্য একই প্রযুক্তিভিত্তিক পৃথক ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেছেন। তাঁরা বর্তমানে এমন একটি সার্বজনীন মৌসুমি ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে প্রাণীর ওপর গবেষণা করছেন, যা প্রতি বছর পরিবর্তন করার প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু ভাইরাস ও ভাইরাল হেমোরেজিক জ্বরের (যার মধ্যে ইবোলা ভাইরাসের বিভিন্ন ধরন থাকবে) বিরুদ্ধেও ভ্যাকসিন তৈরির প্রচেষ্টা চলছে।
এ গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকা অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন দলের পরিচালক অধ্যাপক এন্ডি পোলার্ড বলেন, প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় এই পদ্ধতি ইতোমধ্যে শক্তিশালী প্রমাণ তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় তথ্য। অনেকেই ধারণা করেননি যে এভাবে রোগপ্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।’ তবে মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে এটি কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ-এর বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক মেরিন নাইট বলেন, ‘এআই-নকশা করা এই ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’-এর সফল পরীক্ষা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি।’
মন্তব্য করুন