তরুণ কণ্ঠ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ১১:৩১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে অপহরণের পর হত্যা

ছবি: সংগৃহীত

ভূমধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসে কাজে যোগ দিতে বের হওয়ার ১০ দিন পর শাহরিয়ার আহমেদ ওরফে ইমন (২২) নামের এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর গলিত লাশ উদ্ধার করেছে দেশটির পুলিশ। লারনাকা শহরের কোফিনু এলাকার একটি নির্জন স্থান থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় তাঁর মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়। গত ১১ জুন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে শাহরিয়ারের মুঠোফোন ব্যবহার করে তাঁর গ্রিসপ্রবাসী বাবার কাছে ৩৫ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ লাখ টাকা) মুক্তিপণ দাবি করে আসছিল অপহরণকারীরা।

নিহত শাহরিয়ার আহমেদ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার লোচনপুর গ্রামের বাসিন্দা ও গ্রিসপ্রবাসী নাসির মিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিন মাস আগে শিক্ষার্থী ভিসায় সাইপ্রাসে আসা শাহরিয়ার লারনাকার ওরোক্লিনি এলাকায় বসবাস করতেন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গত রোববার শাহীন বাবু (২২) নামের আরেক বাংলাদেশি তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে সাইপ্রাস পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মাটিচাপা দেওয়া লাশ এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধার করা হয়। তবে গ্রেপ্তারকৃত শাহীন বাবুর দেশের বাড়ি বাংলাদেশের কোন জেলায়, তা পুলিশ এখনও নিশ্চিত করেনি।

সাইপ্রাস পুলিশের বরাত দিয়ে নিহতের স্বজনেরা জানান, নিখোঁজ হওয়ার রাতেই শাহরিয়ারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ অভিযুক্ত তরুণের কাছ থেকে শাহরিয়ারের মুঠোফোনটি উদ্ধার করে। পরবর্তীতে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিন মাস আগে পবিত্র রমজানের শেষ দিকে সাইপ্রাসে যান শাহরিয়ার। অনলাইনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি চাকরির খোঁজ করছিলেন তিনি, যাতে পরিবার থেকে আর টাকা নিতে না হয়। ১১ জুন বিকেলে মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ ফোনালাপে শাহরিয়ার জানিয়েছিলেন, ‘আজকে একটি চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। নাইট ডিউটি। আজ রাতেই জয়েন। দোয়া কইরো।’

সেই রাতে স্থানীয় সময় ৯টায় কাজের স্থানে পৌঁছে নিজের ঘরের বাসিন্দা ও দূর সম্পর্কের আত্মীয় রায়হান মিয়াকে হোয়াটসঅ্যাপে নিজের অবস্থান (লোকেশন) পাঠান শাহরিয়ার। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর থেকেই তাঁর নম্বরটি আর সচল ছিল না। রাত ১০টার দিকে শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ থেকেই তাঁর বাবার কাছে একটি হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছি। ছেলেকে ফিরে পেতে চাইলে ৩৫ হাজার ইউরো দিতে হবে। যদি দেন ছেলেকে ফিরে পাবেন, না দিলে তাঁর চোখ ও কিডনি খুলে বিক্রি করে দেব।’

প্রাথমিকভাবে আইডি ‘হ্যাক’ হয়েছে মনে করা হলেও, পরদিন সকালে শাহরিয়ার ঘরে না ফেরায় রায়হান মিয়া পুলিশে ডায়েরি করেন। এদিকে অপহরণকারীদের সঙ্গে পরিবারের পক্ষ থেকে দর-কষাকষি করে ৫ লাখ টাকা দিতে রাজি হওয়া সত্ত্বেও ছেলের সঙ্গে কথা বলতে না দেওয়ায় রোববার দুপুরে ব্যাংক থেকে ফিরে আসেন স্বজনেরা। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাইপ্রাসে থাকা পরিচিতদের মাধ্যমে শাহরিয়ারের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

ছেলের শোকে কাতর মা পাপিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেরে যারা মারছে, তাদের বিচার চাই। আপনারা ছেলের লাশটা দেশে আইন্যা দেন, আমি একবারের জন্য ছুঁয়ে দেখব।’

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে রায়পুরার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা জানান, সাইপ্রাসে রায়পুরার এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধারের খবর তারা পেয়েছেন। তবে সাইপ্রাসের বাংলাদেশ দূতাবাস বা নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি। পরিবার থেকে আবেদন করা হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনাসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন