প্রকাশিত: ১৭ ঘন্টা আগে, ০৫:২৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক বেইজিং সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং তা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১২টায়) সেন্ট্রাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এই তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরটির অর্জন ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সফরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোর সাফল্য তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, "চীনে প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে একটা দীর্ঘমেয়াদী, কৌশলগত, অংশীদারিত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যার ভিত্তিতে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পেরিয়ে বহুমাত্রিক সম্পর্কে রূপ নিয়েছে।" এই সংক্ষিপ্ত সফরে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথকভাবে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান, সহযোগিতা ও দুদেশের নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি। মুখপাত্র আরও জানান, চীনা নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ৫০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনবদ্য ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘ওয়ান চায়না পলিসি’ বা একক চীন নীতির প্রতি সুসংহত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমান সরকারের জন-কেন্দ্রিক নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের গতিপ্রকৃতি দেখে চীনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে চীনের স্থানান্তরিত হতে যাওয়া কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কীভাবে প্রাধান্য দেওয়া যায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, তা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। চলমান সড়ক, সেতু ও রেলওয়ে প্রকল্পের পাশাপাশি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল এবং মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত বাস্তবায়নে চীন অগ্রাধিকার দেবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারভুক্ত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ ও সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার নকশা থেকে শুরু করে কারিগরি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় চীন সরকার ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দুই দেশের অর্থনীতিকে আরও সম্প্রসারিত করতে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করে একটি আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং মোংলা বন্দরকে আরও সেবাধর্মী করতে চীন কাজ করবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ম্যান্ডারিন ভাষাকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া, কারিগরি শিক্ষা, চিকিৎসাক্ষেত্রে রোবটিক সার্জারিসহ আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশিদের জন্য চীনের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে মাহদী আমিন স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশ নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায় এবং এ লক্ষ্যে মায়ানমারের সঙ্গে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় চীন মধ্যস্থতা বা সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই সফরের অন্যতম বড় কৌশলগত অর্জন হিসেবে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ের সমন্বয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ বা দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার আওতায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা নিয়মিত সংলাপে বসবেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি চীনের সমর্থন এবং ভবিষ্যতে ব্রিকস (BRICS) জোটে বাংলাদেশের সদস্যপদের আবেদনকে বেইজিং স্বাগত জানাবে বলে উপদেষ্টা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি ‘নতুন ব্লুপ্রিন্ট’ বা রূপরেখা হিসেবে আখ্যা দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদ, সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হকসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন