প্রকাশিত: ৪৭ মিনিট আগে, ০৫:১৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম টানা ছয় দিন ধরে কমছে। বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলারে নেমেছে। এভাবে দরপতন অব্যাহত থাকলে গত বছরের আগস্টের পর এবারই প্রথম টানা ছয় দিন তেলের দাম কমার ঘটনা ঘটবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমেছে। গত পাঁচ দিনে এই জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমেছে।
তেলের বাজারে সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে সরবরাহ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক চাহিদা নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। মঙ্গলবার সৌদি আরব জানিয়েছে, দেশটি ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর উপকূল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরুর প্রস্তুতিও চলছে।
এদিকে জুনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান প্রথমবারের মতো আলোচনায় বসেছে। একই সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের প্রস্তুতি চলছে। এসব ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাও তেলের বাজারে বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে।
তেলের দাম কমার পাশাপাশি চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারও নতুন উচ্চতায় উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আশাবাদের মধ্যে মঙ্গলবার নাসডাক-১০০ সূচক নতুন রেকর্ড গড়েছে।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এভারব্রাইট সিকিউরিটিজ ইন্টারন্যাশনালের কৌশলবিদ কেনি এনজি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের ফলাফল দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি খাতের প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাঁর মতে, বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখে বিনিয়োগকারীদের অন্ধভাবে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত আসে, তা দেখার পর দুই দেশের নীতিগত অবস্থান আরও পরিষ্কার হতে পারে।
বিএনপি পারিবাস ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের এশিয়া অঞ্চলের উপপ্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা গ্রেস ট্যাম বলেন, তেলের দাম কমে আসায় অক্টোবরে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কিছুটা কমেছে। তাঁর হিসাবে, এ সম্ভাবনা এখন ৫৩ শতাংশ।
তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় কম থাকবে—এমন ধারণা এখনো বাজারে পুরোপুরি তৈরি হয়নি। পরিস্থিতির আবার দ্রুত অবনতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকেরা এক নোটে বলেছেন, বছরের শেষ তিন মাসে চীনের তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা কম। চীনের তেল কেনা কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে চাহিদাজনিত চাপও কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে বেইজিং কৌশলগত মজুত থেকে তেল ব্যবহার করছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
তাঁদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ও রপ্তানির অবকাঠামোয় হামলা আরও বাড়া এখন তেলের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি। চীনের তেল আমদানি বাড়াকে তাঁরা প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন না।
অন্যদিকে বিশ্ব বন্ডবাজারও বুধবার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার দশমিক ০১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ হয়েছে।
জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাব বিভিন্ন দেশের বন্ডের সুদের হারেও পড়েছে। শিকাগো ফেডারেল রিজার্ভের প্রেসিডেন্ট অস্টান গুলসবিও সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে তেলের দাম ছাড়াও যদি দীর্ঘস্থায়ী কোনো কারণ থাকে, তাহলে ফেডারেল রিজার্ভকে দ্রুত ও আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৪৩ ডলার হলে এক ব্যারেল তেলের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় নির্ভর করবে ওই সময়ের ডলার বিনিময় হারের ওপর। এক ব্যারেলে প্রায় ১৫৯ লিটার তেল থাকে। ফলে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৬২ সেন্ট।
ডলারের দাম ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৭৬ টাকা। তবে এটি কেবল আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য। পরিবহন, বিমা, বন্দর, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারি শুল্ক-কর যুক্ত হওয়ার পর দেশে তেলের চূড়ান্ত বাজারমূল্য নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের সীমিত পরিশোধন সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন তেল পরিশোধন করা যায়, বিপরীতে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন তেল আমদানি করতে হয়। ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিশোধিত তেলও আমদানি করতে হয়।
মন্তব্য করুন