তরুণ কণ্ঠ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০৪:৪৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

কলের মিস্ত্রি পরিচয়ে ঘরে প্রবেশ, প্রতিবেশীর তৎপরতায় রক্ষা পায়নি ঘাতক অন্তর

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরে মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার নিজেকে কল ও পাইপলাইনের মিস্ত্রি পরিচয় দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে প্রতিবেশী আফরোজা বেগমের সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে ঘাতক ঘটনাস্থল থেকে পালাতে পারেনি। অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার নিজেকে ‘জহির’ নামে মুসলিম পরিচয় দিয়ে এক নারীকে নিয়ে ওই ভবনে গত এক বছর ধরে বসবাস করছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে প্রতিবেশী আফরোজা বেগম বলেন, "তার (অন্তর) হাতে প্যান্ট ছিল। বিষয়টি আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। আমি ভাবলাম, হয়তো শাহিনুর বাসায় নেই। কলের মিস্ত্রি পরিচয়ে এসে মেয়েদের সঙ্গে খারাপ কিছু করেছে। তখনই আমার সন্দেহ হয়।" এর কিছু সময় আগে ঘরের ভেতর থেকে ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার শুনে জানালার পাশে ছুটে গিয়েছিলেন আফরোজা। তিনি আরও বলেন, "প্রথমে চিৎকার শুনছিলাম। পরে হঠাৎ সব চুপ হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর জানালা দিয়ে দেখি একজন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, ওটা হয়তো শাহিনুরের ছেলে সিফাত। আমি সিফাত বলে ডাকলাম, কিন্তু তারও কোনো উত্তর পাইনি। কিছুক্ষণ পর আড়াল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জানালা বন্ধ করার শব্দ শুনি। তখন আমার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।"

পরিস্থিতি অস্বাভাবিক অনুধাবন করে আফরোজা বেগম তাৎক্ষণিকভাবে বাইরে থেকে বাসার প্রধান দরজা আটকে দেন এবং প্রতিবেশীদের খবর দেন। পরে স্থানীয় লোকজন ঘরে ঢুকে মেঝেতে মা ও তিন মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এই সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার পালানোর উদ্দেশ্যে ভবনের ছাদে উঠে গেলে স্থানীয় জনতা তাকে আটকে গণপিটুনি দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর আড়াইটার দিকে তার মৃত্যু হয়।

রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ে একটি ভাড়া বাসায় এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮) এবং তার তিন মেয়ে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইমা আক্তার (২০), রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ইকরা বেগম (১৭) ও সিপা (৯)। নিহতদের মূল বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় হলেও তারা দীর্ঘ ২৫-২৬ বছর ধরে রায়পুরে বসবাস করছিলেন। অন্যদিকে, নিহতদের পিতা কামাল হোসেন ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যান। অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দাসেরহাটের বাসিন্দা এবং রায়পুরে ভাসমান ফল বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রছাত্রী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার (২৭ জুন) সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভুঁইয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশের ডিআইজি মনিরুজ্জামানও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। বর্তমানে পুলিশ, সিআইডি ও র‌্যাব যৌথভাবে ঘটনাটি তদন্ত করছে। এই ঘটনায় রায়পুর থানায় দুটি পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে—একটি নিহতদের ছেলে বাদী হয়ে এবং অন্যটি গণপিটুনিতে অভিযুক্তের মৃত্যু ও পুলিশ সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে। রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, "ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি দা আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একজনই এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। হত্যার মূল কারণ এখনো উদঘাটন করা যায়নি। প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।"

মন্তব্য করুন