জিপিএ ৫
উত্থানের ২২ বছরের পর সর্বোচ্চ চূড়া থেকে টানা চার বছরের পতন
ছবি: তরুণ কণ্ঠ গ্রাফিক্স
সংখ্যাটি ছিল মোটে ৭৬। ২০০১ সালে যখন এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হয়, তখন দেশজুড়ে মাত্র এই কয়জন শিক্ষার্থীই অর্জন করতে পেরেছিল সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ ৫। দুই যুগেরও কম সময়ে সেই সংখ্যা হাজার গুণ বেড়ে ২০২২ সালে পৌঁছে যায় সর্বকালের সর্বোচ্চ চূড়ায়, ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জনে। কিন্তু তারপরের অধ্যায়টা একেবারেই উল্টো পথের, টানা চার বছর ধরে কমতে কমতে চলতি বছর তা নেমে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে, যা শীর্ষ সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকেরও কম। দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে গত ২৫ বছরের এসএসসি ফলাফলের এই বিচিত্র চিত্র।
এর আগে পুরনো নম্বরভিত্তিক মূল্যায়নে ৮০ বা তার বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের দেওয়া হতো লেটার মার্কস। ২০০১ সালে এই ব্যবস্থা বাতিল করে চালু হয় গ্রেডিং সিস্টেম, যেখানে সর্বোচ্চ গ্রেড নির্ধারণ করা হয় জিপিএ ৫। প্রথম বছরের সেই ৭৬ জন থেকে ২০০২ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩০-এ, আর ২০০৩ সালে ছুঁয়ে যায় ১ হাজার ৩৯২।
২০০৪ সাল থেকেই লক্ষণীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার। সে বছর ৮ হাজার ৫৯৭ জন এই গ্রেড অর্জন করে, যা ২০০৫ সালে ১৭ হাজার ৬৩১ এবং ২০০৬ সালে ২৪ হাজার ৩৮৪-এ পৌঁছায়। এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকে পরবর্তী বছরগুলোতেও, ২০০৭ সালে ২৫ হাজার ৭৩২, ২০০৮ সালে ৪১ হাজার ৯১৭ এবং ২০০৯ সালে ৪৫ হাজার ৯৩৪ জন শিক্ষার্থী অর্জন করে সর্বোচ্চ গ্রেড। এরপর ২০১০ সালে সংখ্যাটি একলাফে পৌঁছায় ৫২ হাজার ১৩৪-এ, ২০১১ সালে ৬২ হাজার ২৪৪ এবং ২০১২ সালে ৮২ হাজার ২১২-তে গিয়ে ঠেকে। ২০১৩ সালে তা দাঁড়ায় ৯১ হাজার ১২২ জনে।
২০১৪ সালে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লাখ ছাড়িয়ে যায় জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা, সে বছর ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জন অর্জন করে এই গ্রেড। তবে এই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরের বছরই ২০১৫ সালে সংখ্যাটি নেমে আসে ১ লাখ ১১ হাজার ৯০১-এ, ২০১৬ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৯ হাজার ৭৬১-তে। এরপর তিন বছর মোটামুটি একই পর্যায়ে ওঠানামা করে ফলাফল, ২০১৭ সালে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৬১, ২০১৮ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ এবং ২০১৯ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৯৪।
২০২০ সালে করোনা মহামারির প্রভাব সরাসরি পড়ে পরীক্ষার ফলে, সে বছর জিপিএ ৫ পায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন। এরপর ২০২১ সালে মহামারির কারণে পরীক্ষা ছাড়াই দেওয়া হয় অটোপাস, ফলে সেই বছর জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জনে।
মহামারি-পরবর্তী প্রথম স্বাভাবিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০২২ সালে, আর সে বছরই ভাঙে সব রেকর্ড, জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা পৌঁছায় ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জনে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু সেই শীর্ষবিন্দু ছোঁয়ার পরই শুরু হয় নিম্নমুখী যাত্রা। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জনে, ২০২৪ সালে আরও কমে হয় ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা নেমে আসে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জনে, আর চলতি বছর তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে।
এই ধারাবাহিক পতনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, 'অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিজেদের সফলতা দেখাতে পাসের হার ও জিপিএ ৫ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা ছিল।'
ভবিষ্যতে এই প্রবণতা কোন দিকে যেতে পারে, তা নিয়ে তিনি বলেন, 'মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ওভার মার্কিং বা আন্ডার মার্কিং ইস্যুতে ধিরে ধিরে একটি সঠিক জায়গায় আসার চেষ্টা করবে সরকার। এ বছর পাশের হার যতটা হয়েছে সামনের বছর এ হার এর থেকেও কম হতে পারে।'