রাফিউল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশিত: ১০ আগষ্ট, ২০২৬, ০২:০৮ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ইরান যুদ্ধের ছয় মাস

জেনারেলদের সতর্কবার্তা উপেক্ষার ফল ভোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: তরুণ কণ্ঠ গ্রাফিক্স

কোনো যুদ্ধ যখন প্রতিশ্রুত সময়সীমা বহুগুণ পেরিয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে স্বাভাবিকভাবেই, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আসলে কী ভুল হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত এখন ঠিক সেই প্রশ্নের মুখোমুখি।ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চার-ছয় সপ্তাহে শেষ হওয়ার কথা থাকা এই যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে, অথচ কোনো সমাধানের ইঙ্গিত নেই। আর এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে যে বিষয়টি বারবার সামনে আসছে, তা হলো, যাদের কাজই যুদ্ধক্ষেত্র বোঝা, সেই অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাদের মতামত রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা গুরুত্ব দিয়ে শুনছে ওয়াশিংটন।

ইতিহাসে এই প্যাটার্ন নতুন নয়। ক্ষমতার শীর্ষে বসা মানুষ যখন নিজের সিদ্ধান্তে এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন যে অভিজ্ঞদের সতর্কবার্তাকে গুরুত্বহীন মনে করেন, তখন তার মাশুল দিতে হয় , কখনো একটি জাতিকে, কখনো তার মিত্রদের। রোমান সম্রাট অগাস্টাস টয়টোবার্গের বনে তিনটি লিজিওন হারিয়ে যতটা বিলাপ করেছিলেন, ততটাই প্রাসঙ্গিক আজও, ক্ষমতা যখন অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে যায়, তার ফল ভালো হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এই প্রবণতা স্পষ্ট। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জকে এপ্রিলের শুরুতে হঠাৎ অবসরে পাঠানো হয়, কোনো সরকারি ব্যাখ্যা ছাড়াই। সময়টা লক্ষণীয়: প্রেসিডেন্টের এক ভাষণে যুদ্ধ আরও জোরদার করার ঘোষণার ঠিক পরের দিনই এই সিদ্ধান্ত আসে। যে জেনারেল প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরানে স্থল অভিযান একরকম আত্মঘাতী পদক্ষেপ হতে পারে, তাকেই সরিয়ে দেওয়া হলো। এখানে বার্তাটা স্পষ্ট, পেশাদার আপত্তি এই প্রশাসনে বরখাস্ত হয়, শোনা হয় না।

জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের অভিজ্ঞতাও একই রকম। মাসের পর মাস তিনি হোয়াইট হাউজকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়, প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত প্রস্থান-কৌশল। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেছিলেন। এই সতর্কবার্তার জবাবে নীতি পুনর্বিবেচনার বদলে এসেছে জনসমক্ষে দাবি, দেশের কাছে "বিপুল পরিমাণ" অস্ত্র মজুত আছে, আর তথ্য ফাঁসকারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। বাস্তবতা আর প্রকাশ্য বক্তব্যের মধ্যে এই ফারাক নিজেই একটা সতর্কসংকেত।

সংখ্যাগুলো নেহাত অনুমান নয়। গবেষণা সংস্থার হিসাবে, ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টরের মজুত প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। এই ঘাটতি মেটাতে বছরের পর বছর লাগবে, কারণ শীতল যুদ্ধের সময়কার বিশাল উৎপাদন-ভিত্তি এখন আর নেই, বহু প্রতিষ্ঠান একীভূত হয়ে হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে, যাদের উৎপাদন-ক্ষমতা এত দ্রুতগতির যুদ্ধের চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি নয়। পেন্টাগন তড়িঘড়ি করে বিলিয়ন ডলারের নতুন চুক্তি করছে, উৎপাদন লাইন বাড়ানোর নির্দেশ দিচ্ছে, যা দাপটের নয়, বরং সংকট সামাল দেওয়ার ভাষা।

এই ঘাটতির প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল উপসাগরীয় মিত্ররা এখন বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছে। এটি এক অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব ক্ষয়ের ইঙ্গিত, যে অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই অঞ্চলই এখন মার্কিন নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।

এই সংঘাতের সূচনা ফেব্রুয়ারিতে, যখন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি ছিল দ্রুত সমাপ্তির, বাস্তবতা হলো দীর্ঘায়িত অচলাবস্থা, যেখানে এখন ইরানই কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের শর্ত নির্ধারণ করছে।

ইতিহাস বারবার একই শিক্ষা দিয়েছে। জেনারেলরা পরিকল্পনা করেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেন রাজনীতিবিদরা, আর প্রায়ই তারা নীরবতাকে সম্মতি বলে ভুল বোঝেন। দীর্ঘায়িত যুদ্ধ থেকে কোনো জাতি লাভবান হয়েছে, এমন নজির ইতিহাসে বিরল। যে নেতারা অভিজ্ঞদের কথা শুনেছেন, ইতিহাস তাদের দুর্বল বলে মনে রাখেনি, বরং যারা শোনেননি, তাদেরকেই স্মরণ করে অনেক কম করুণার সঙ্গে।

মন্তব্য করুন