তরুণ কণ্ঠ অনলাইন

প্রকাশিত: ৫৯ মিনিট আগে, ০৫:২৯ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

অনুপস্থিতির অভিযোগে বরখাস্ত হচ্ছেন বিপ্লব কুমার সরকারসহ ৫ পুলিশ কর্মকর্তা

ছবি: তরুণ কণ্ঠ গ্রাফিক্স

দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। শিগগিরই এ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করতে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এমনটাই জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

বরখাস্ত হতে যাওয়া বাকি চার কর্মকর্তা হলেন মো. গোলাম রুহানী, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রাজন কুমার দাস ও মো. ইকবাল হোসাইন।

সংশ্লিষ্ট নথি ঘেঁটে জানা গেছে, এই পাঁচজনের মধ্যে বিপ্লব কুমার সরকার বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন। সাবেক ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর ছোট ভাই মো. গোলাম রুহানী সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বর্তমানে পলাতক অবস্থায় আছেন। একই অবস্থায় রয়েছেন সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, যিনি সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত। রাজন কুমার দাসও সাময়িক বরখাস্ত ও পলাতক, আর মো. ইকবাল হোসাইন সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন।

কী কারণে এই ব্যবস্থা— এ প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, কর্মস্থলে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকা এবং পলায়নের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হয়েছিল, আর তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরই চাকরিচ্যুতির গুরুদণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

নথি অনুযায়ী দেখা যায়, অনুমোদিত ছুটি শেষ হওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফেরেননি এই কর্মকর্তারা। এমনকি নোটিশ পাঠানোর পরও তারা যোগদান করেননি এবং নিজেদের অবস্থান সম্পর্কেও কর্তৃপক্ষকে কিছু জানাননি। যেহেতু তাদের অননুমোদিত অনুপস্থিতির মেয়াদ ৬০ দিনের বেশি হয়ে যায়, তাই সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বিধিমালার ৩(খ) ও ৩(গ) ধারা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আনা হয় 'অসদাচরণ' ও 'পলায়ন'-এর অভিযোগ। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেননি, ফলে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হওয়ায় চাকরিচ্যুতির গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফায়ও কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেননি।

সবকিছু পর্যালোচনা করে অভিযোগ প্রমাণিত থাকায় চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। এরপর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পরামর্শকরণ) রেগুলেশনস, ১৯৭৯ অনুযায়ী গুরুদণ্ড আরোপের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ চাওয়া হয়, এবং কমিশনও তাদের চাকরিচ্যুতির পক্ষেই মত দেয়।

এরপর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৪(৬) বিধি অনুযায়ী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

শুধু চাকরিবিধি লঙ্ঘনই নয়, এই পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই রয়েছে আরও গুরুতর অভিযোগ। বিপ্লব কুমার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলমান, যেখানে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দমনপীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিএমপির মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ভাই ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বানীর রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে গোলাম রুহানীর বিরুদ্ধে। তিনি ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট থেকেই অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত এবং বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।

এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সুদীপ কুমার চক্রবর্তীকে ঘিরে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছাত্র-জনতা হত্যার দায়ে তাকে ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ২৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করে।

সুনামগঞ্জের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে সাধারণ শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে বলপ্রয়োগ, লাঠিচার্জ ও শর্টগানের গুলি চালানোর নির্দেশদাতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন।

আর তালিকার পঞ্চম কর্মকর্তা, ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের সাবেক ডিসি মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে আইসিটিতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলমান। ২০২৪ সালের আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে দেওয়া তার একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। ভাইরাল সেই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, 'গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার...।'

মন্তব্য করুন