মো: রিফাত হোসাইন

প্রকাশিত: ১২ মে, ২০২৬, ১১:৩৩ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

‘হাফ-বেকড রিফর্ম বিপজ্জনক’, এনবিআর সংস্কারই এখন মাস্ট বললেন অর্থমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার রাতে রাজধানীর হোটেল শেরাটনে দৈনিক বণিক বার্তার ‘সোনার বাংলা’ নীতি-আলোচনায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যার ফলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও নাগরিক সেবাদানের সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, যেকোনো অর্থনীতিতে রিসোর্স মোবিলাইজেশন সবচেয়ে ফান্ডামেন্টাল বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত একসময় ১০ থেকে ১১ শতাংশ থাকলেও এখন তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে নিম্ন ট্যাক্স-জিডিপি সম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে আমরা চলে গেছি। দক্ষিণ এশিয়ায়ও আমরা সবচেয়ে নিচে। বর্তমানে এ অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, এটিকে ফের বাড়ানোই সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ফিসক্যাল স্পেস না থাকলে উন্নয়ন কর্মসূচি নেওয়া যায় না, সামাজিক কর্মসূচিও চালানো যায় না। তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও কমতে থাকে। নাগরিকদের দৈনন্দিন সেবা দেওয়া থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান বাড়ানো—সব ক্ষেত্রেই সরকারের সক্ষমতা কমে যায়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারকে অপরিহার্য আখ্যা দিয়ে অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করেন, এনবিআর রিফর্ম ইজ এ মাস্ট। তবে আগের সরকারের উদ্যোগকে ‘অসম্পূর্ণ’ বলে কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তার ভাষায়, ওই উদ্যোগ আসলে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ছিল না। অসম্পূর্ণ সংস্কার (হাফ-বেকড রিফর্ম) বিপজ্জনক। কিছু না থাকলে বরং সুবিধা হতো। কিন্তু অসম্পূর্ণ অবস্থায় রেখে দিলে সেটা আরও সমস্যার সৃষ্টি করে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিগত কাঠামো পুনর্বিবেচনার উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথমে ওই অসম্পূর্ণ কাঠামোটি বাতিল বা সংশোধন করতে হবে, এরপর নতুনভাবে সংস্কার করতে হবে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর দুইভাগে বিভক্ত (বাইফারকেশন) করতে চাই।

করপলিসি প্রণয়ণে আমলাতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার বাইরে যাওয়ার তাগিদ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ট্যাক্স পলিসি যারা নির্ধারণ করবে, তাদের বাংলাদেশের অর্থনীতির ডিএনএ বুঝতে হবে। দেশের প্রতিটি সেক্টরের বাস্তবতা, ব্যবসায়ীদের সমস্যা, সাধারণ মানুষের চাহিদা—সবকিছু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। শুধু অফিসে বসে হিসাব মিলানোর জন্য কর বাড়ালে হবে না। ব্যবসার পেইন বুঝতে হবে, ইন্ডাস্ট্রির পেইন বুঝতে হবে, সাধারণ মানুষের পেইন বুঝতে হবে।

অতিরিক্ত করের চাপে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, যারা বিনিয়োগ করছে, যারা মূলধন রিজার্ভ বাড়াচ্ছে, তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করলে তারা পুনরিবিনিয়োগ করতে পারবে না। এই জায়গায় আমাদের ট্যাক্স পলিসিতে পরিবর্তন আসবে। করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তিনি আরও বলেন, আমরা চাই ট্যাক্স পলিসির সুপারিশ সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়ে আসুক। মাঝখানে অতিরিক্ত ব্যুরোক্রেটিক ট্যাঙ্গেল (প্রশাসনিক জটিলতা) থাকলে সমস্যা তৈরি হয়।

রাজস্ব আহরণের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নেও বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পেতে হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় বিনিয়োগের বিকল্প নেই। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত এই খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। যদিও এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় যেতে পারিনি, তবে আগামী ৪-৫ বছরে এই বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে তিনি বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়িয়ে রেমিট্যান্স আয় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথাও জানান।

তবে অতীতে দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের ব্যর্থতার কারণ উল্লেখ করে তিনি কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন, অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন ছাড়া কোনো স্কিলিং প্রকল্প কার্যকর হয় না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভবিষ্যতে কোনো ভোকেশনাল বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া বিনিয়োগ করা হবে না।

মন্তব্য করুন