নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ মে, ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

সিসিএফ মোঃ আমীর হোসাইন চৌধুরীকে ঘিরে দুর্নীতি, প্রকল্প অনিয়ম ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ

বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক (CCF) মোঃ আমীর হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা প্রশাসনিক মহল, তদন্ত সংস্থা এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, পদায়ন ও বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতিতে বিধি লঙ্ঘন, এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব। যদিও এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং আদালত বা চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত নয়, তবুও বিষয়গুলো বন প্রশাসনের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার “টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল)” প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় বন সংরক্ষণ, বনায়ন সম্প্রসারণ এবং জীবিকা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত বিপুল অর্থের একটি অংশ যথাযথভাবে ব্যয় না হয়ে কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের অনুসন্ধানে বলা হয়, প্রকৃত মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নের তুলনায় প্রকল্পের অগ্রগতি কাগুজে হিসাবেই বেশি দেখানো হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি খতিয়ে দেখে।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে যে, কিছু এলাকায় যেসব বনায়নের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে নির্দিষ্ট বনাঞ্চলে শত শত হেক্টর জমিতে বনায়নের দাবি করা হলেও বাস্তবে তার একটি অংশেই গাছ রোপণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। কিছু ক্ষেত্রে সাইনবোর্ড স্থাপন করেই বনায়নের কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যদিও প্রকৃত গাছের উপস্থিতি সেখানে সীমিত বা অনুপস্থিত ছিল।

একই সঙ্গে প্রকল্পের আওতায় নার্সারি স্থাপন ও চারা উৎপাদনের জন্য যে বিশাল বাজেট বরাদ্দ ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অনেক জায়গায় নার্সারি স্থাপন না করেই অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে, অথবা আংশিকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে গুরুতর অনিয়মের সন্দেহ তৈরি হয়।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক পর্যায়ে পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও উঠে আসে মোঃ আমীর হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জ কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদে বদলি বা পোস্টিং দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু কর্মকর্তা সুবিধাজনক পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য অর্থ প্রদান করেছেন—এমন দাবি বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যদিও এসব অভিযোগ প্রমাণিত নয়, তবে প্রশাসনিক মহলে এগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।

পদোন্নতি সংক্রান্ত অভিযোগও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অভিযোগ রয়েছে, জ্যেষ্ঠতা ও সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে কিছু নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে আদালতে মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে। এসব মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের সুবিধাজনক পদে উন্নীত করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম বন ভবনে অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে প্রাথমিকভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব এবং বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। যদিও এটি ছিল প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, তবুও এটি বন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

এর আগে ২০২২ সালে আদালতের একটি আদেশ অমান্য করার অভিযোগে মোঃ আমীর হোসাইন চৌধুরীকে হাইকোর্টে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এই ঘটনাও তার প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের অংশ হিসেবে আলোচিত হয়।

বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয় যে, তিনি প্রশাসনিক পর্যায়ে একটি প্রভাবশালী বলয় বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার মাধ্যমে বন বিভাগের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করা হতো। কিছু প্রতিবেদনে সাবেক রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ করা হয়, যদিও এসব দাবি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো বনায়ন প্রকল্পে “কাগুজে বাস্তবায়ন”। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বনাঞ্চলে যে পরিমাণ গাছ লাগানোর কথা ছিল, বাস্তবে তার অনেক কম গাছ রোপণ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শুধু রেকর্ডপত্রে বনায়নের তথ্য দেখানো হয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—পরিবেশ সংরক্ষণ ও বনসম্পদ উন্নয়ন—বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।

বদলি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৪ সালের সরকারি বদলি নীতিমালা উপেক্ষা করে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাবেক বনমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব অভিযোগের অধিকাংশই তদন্তাধীন বা অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বিচারিক রায় বা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি, যা মোঃ আমীর হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বন অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কাঠামো, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

দুদকের চলমান অনুসন্ধান ও অন্যান্য প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফল ভবিষ্যতে এই অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণ করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। একই সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে বিভিন্ন মহল থেকে।

মন্তব্য করুন