প্রকাশিত: ১৪ মে, ২০২৬, ১০:৪৩ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
সরকারি হিসাব বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার। একই সময়ে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, সুদহার বৃদ্ধি ও ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় দেশের রিজার্ভ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে নেওয়া মোট বিদেশি ঋণের ৭৮ শতাংশই এই সরকার গ্রহণ করেছে, যার বড় অংশ ব্যয় করা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রানির্ভর প্রকল্পে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাচার ও উচ্চ সুদের কারণে এই ঋণের বোঝা সরাসরি জনগণের ওপর গিয়ে পড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের সময় বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের জুনে তা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৪১ কোটি ডলারে। অর্থাৎ ১৫ বছরে ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণেরও বেশি। একই ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার মানে বড় ধস নামে। ২০০৯ সালে যেখানে এক ডলারের দাম ছিল ৬৯ টাকা, বিদায়ের সময় ২০২৪ সালের আগস্টে তা ১২০ টাকায় পৌঁছায়। ব্যাংকে কোনো কোনো সময় ১৩২ টাকা দামেও ডলার বিক্রি হয়েছে।
অঙ্কের এই খেলায় কেবল মুদ্রামানই নয়, বেড়েছে ঋণের সুদের বোঝাও। ২০০৯ সালে বৈদেশিক ঋণের সুদ হার ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। বর্তমানে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ থেকে ৯ শতাংশে। বৈশ্বিক মন্দার কারণে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে এই হার আরও বেশি ছিল। চুক্তি অনুসারে মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশের সুদ ও বিনিময় হার বাজারভিত্তিক হওয়ায় ভবিষ্যতে পরিশোধের খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই নীতির ফলে ঋণ পরিশোধের সময় যে বাজার-হার থাকবে, সেই ভিত্তিতেই সুদ ও আসল শোধ করতে হবে।
একই রকম চিত্র মাথাপিছু ঋণেও। ২০০৯ সালে প্রতিটি নাগরিকের মাথায় বৈদেশিক ঋণের বোঝা ছিল ১৬৯ ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে তা বেড়ে ৬০৭ ডলারে ঠেকে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে ৬৫৭ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপে রিজার্ভ ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত শুধু সরকারি খাতে ৪০০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। গোটা অর্থবছরে এই অঙ্ক ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে বছরে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হতো।
ঋণ পরিশোধের বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় রাজস্ব আয় বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার অর্থ দিয়ে ডলার কিনে তা পরিশোধ করার কথা। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দায় রাজস্ব আয় কমায় সরকারকে এখন স্থানীয়ভাবে ঋণ করে ডলার কিনতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স দিয়েও এ চাপ সামলানো যাচ্ছে না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে টানা অর্থ তুলে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাত ২০২০ সালের ৬০ শতাংশ থেকে নেমে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩ শতাংশে।
বিষয়টির গভীরে গিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণের অর্থের একটি অংশ দেশে না এনে সরাসরি বিদেশে পাচার করায় বিনিয়োগ ও রপ্তানি সক্ষমতায় কোনো সুফল আসেনি। একই সঙ্গে নেওয়া ঋণের সিংহভাগ ব্যয় করা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রানির্ভর প্রকল্পে, যা থেকে কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সেগুলো উন্নয়ন খাতে ব্যয় করলে কিছুটা সুফল মিলত। কিন্তু ঋণের টাকার একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে বিদেশি ঋণের টাকায় দেশে কিছুই করা হয়নি। বরং দেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ায় দেশের দায় বেড়েছে। সাধারণত বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তা যদি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়-এমন সব প্রকল্পে ব্যয় করা হলে তাহলে পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছে তার প্রায় সবই খরচ করা হয়েছে স্থানীয় মুদ্রা নির্ভর প্রকল্পে। ফলে দুভাবে ওইসব ঋণ অর্থনীতিতে ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। এই দুই সূত্র—পাচার ও স্থানীয় আয়নির্ভর প্রকল্পে ব্যয়—পরিশোধের এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বেসরকারি খাতের অনেক ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও বা কারাবন্দি থাকলেও তাদের ফোর্স লোনের দায় চড়া দামে ডলার কিনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে শোধ করতে হচ্ছে, যা শেষমেশ সাধারণ মানুষের ওপরই চাপ সৃষ্টি করছে।
মন্তব্য করুন