প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০২:২১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
সরকারের গণমুখী ও সংস্কারধর্মী কর্মকাণ্ডের ফলে দেশ দ্রুত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তার দাবি, ফ্যাসিবাদের পতনের পর দীর্ঘ বিরতি শেষে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান সরকার সুশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
রোববার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মাহদী আমিন। বাংলাদেশ সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বাসস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে সরকারের গত ১৮০ দিনের কার্যক্রম, সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা উঠে আসে।
সাক্ষাৎকারে মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গণমুখী ও সংস্কারধর্মী নানা উদ্যোগে দ্রুত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেড় দশকের ভাঙাচোরা রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে পথ চলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার।’
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস প্রসঙ্গে টেনে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের বিনা ভোটে প্রহসনের নির্বাচন, ২০১৮ সালের নিশি রাতের ভোট কিংবা ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের মতো অন্ধকার অধ্যায় দেখেছে এ দেশের মানুষ। সেই সময়ে একটি অনির্বাচিত সরকার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করে জনগণের মৌলিক স্বাধীনতা ও অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। তাদের ক্ষমতার মূল ভিত্তি ছিল নতজানু পররাষ্ট্রনীতি। তবে সেই ফ্যাসিবাদের শৃঙ্খল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ যে গণমুখী ও নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে, তার ক্ষমতার একমাত্র উৎস এ দেশের জনগণ। জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসাকে সম্বল করে সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
গত ছয় মাসের অর্জনের খতিয়ান দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, নির্বাচন-পরবর্তী মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই কৃষকদের সুদে-আসলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়, যাতে উপকৃত হয়েছেন ১৩ লাখের বেশি কৃষক। এর পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নে চালু হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ইমাম-মুয়াজ্জিন-খতিবদের জন্য সরকারি ভাতা, খাল খনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী আমাদের এই ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাকে অত্যন্ত প্রশংসা করেছে। এটি কেবল অর্থ সহায়তা নয়; বরং নারীদের স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান করে তোলার একটি নীরব বিপ্লব। নারীরা এই অর্থ সন্তানের পড়াশোনা, পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার কাজে লাগাচ্ছেন। কার্ড বিতরণে কিছু কারিগরি অসংগতি নজরে এলে দ্রুততম সময়ে ডেটাবেজ হালনাগাদ ও ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ সংস্কারের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে, যেন কেবল প্রকৃত প্রাপ্য ব্যক্তিরাই এর সুবিধা পান।’
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পবিত্র রমজান ও দুটি ঈদে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-বোনাস সঠিক সময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করা সরকারের একটি বড় সফলতা ছিল। তবে ফ্যাসিবাদ আমলের বিগত দেড় দশকে ধারাবাহিকভাবে গড়ে ওঠা জ্বালানি সংকট ৬ মাসে শতভাগ সমাধান করা দুরূহ কাজ। তদুপরি মার্কিন ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিকল্প সোর্স থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস ও জ্বালানি নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মাহদী আমিন জানান, মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে এবং চলতি আগস্টের মধ্যেই এই জটিলতার অবসান হতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে আগামী চার মাসে অন্তত এক লাখের বেশি কর্মী সেখানে যাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে জানান তিনি। রিয়েল এস্টেট, কৃষি ও উৎপাদন খাতসহ সব খাতেই বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া জাপান, ওমান, জর্ডান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে কারিগরি ভাষা প্রশিক্ষণ ও জামানতহীন ঋণসুবিধার ব্যবস্থা এবং পূর্ব ইউরোপে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত ৬ মাসে দেশে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দেশ পরিচালনায় চরম সমালোচনা কিংবা উস্কানিমূলক আচরণের মুখোমুখি হয়েও সরকার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ধৈর্য প্রদর্শন করেছে। আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসনকে ফ্যাসিবাদী মানসিকতা থেকে বের করে এনে একটি প্রকৃত সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হচ্ছে। হাতি হত্যা থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব অপরাধের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কোনো অপরাধীকেই দলীয় বা রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না।’
পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান স্পষ্ট করে মাহদী আমিন বলেন, ‘আমাদের বৈদেশিক নীতির মূল কথাই হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। ভারতসহ বিশ্বমঞ্চের সকল রাষ্ট্রের সাথে আমরা সমতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক চাই। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার যে আইনি প্রক্রিয়া, তাতে একটি বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে ভারত পূর্ণ সহযোগিতা করবে বলে বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা।’
অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি জানান, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে ব্যবসা সহজীকরণে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু, বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্গো সেবা এবং কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে সরকারের যে সততা, সদিচ্ছা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা কাজে লাগিয়েই ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
মন্তব্য করুন