প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:১৫ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
কাগজে-কলমে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা শেষ হলেও সার্বক্ষণিক ডিজিটাল যোগাযোগ এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণে ঢাকার করপোরেট খাতের কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ২০২৬ সালের বর্তমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পারফরম্যান্সের চাপ ও ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক পেশাজীবীদের তীব্র উদ্বেগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কর্মজীবন ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট বিশ্লেষণ করে এই অদৃশ্য মানসিক ক্ষতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যা প্রচলিত আট ঘণ্টার কর্মদিবসের ধারণাকে মস্তিস্ক থেকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে।
রাজধানীর একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের একজন দলনেতা অনিকের (ছদ্ম নাম) জীবন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাত্র আটাশ বছর বয়сей তিনি তীব্র মানসিক উৎকণ্ঠার শিকার হয়েছেন। কাজ শেষে কম্পিউটার বন্ধ করার পরও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের অবিরত চাপ তার মানসিক সুস্থতা কেড়ে নিয়েছে। নিজের এই অবর্ণনীয় মানসিক কষ্ট প্রকাশ করে অনিক বলেন, ‘অফিস নাকি বিকেল পাঁচটায় শেষ হয়! কিন্তু রাত দুইটাতেও ফোন শান্ত থাকে না। বসের একটা হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন মানেই বুকটা ধড়ফড় করে ওঠা।’
তরুণদের এই মানসিক বিপর্যয়কে একটি সামগ্রিক সংকট হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকেরা। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক चिकित्सक সরদার আতিক বলেন, ‘অফিস টাইমের পরও অফিশিয়াল যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত থাকার এই মানসিক চাপ তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ এবং অনিদ্রার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দ্রুত এমন এক কর্মপরিববেশ ও গাইডলাইন তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন কর্মী নির্ভয়ে বলতে পারবেন, ‘আমি মানসিক চাপে আছি, আমার ছুটি প্রয়োজন।’
অন্যদিকে, করপোরেট দুনিয়ায় নারী কর্মীদের, বিশেষ করে নতুন মায়েদের মানসিক চ্যালেঞ্জটি আরও বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক। একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দিবা (ছদ্ম নাম) সম্প্রতি মাতৃত্বের স্বাদ পেলেও কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতির অভাব তাকে এক নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের মুখোমুখি করেছে। নথিপত্রে নমনীয় কর্মঘণ্টার মতো সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত কঠিন। নিজের যাপিত জীবনের কষ্ট তুলে ধরে দিবা জানান, ‘সবাই মুখে প্রসূতিকল্যাণ আর নমনীয়তার কথা বলে। কিন্তু মা হওয়ার পর প্রতিদিনের লড়াইটা যে কত নিঃসঙ্গ, তা কেউ বোঝে না। সন্তানের তদারকি শেষে রাতে না ঘুমিয়ে ঠিক সকাল ৯টায় অফিসে পাঞ্চ করতে হয়। কাজের সামান্য কমবেশি হলেই দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।’ মূলত সব দিক নিখুঁতভাবে সামলানোর এই দ্বিগুণ সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ কর্মজীবী মায়েদের দ্রুত চরম মানসিক ও শারীরিক অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বেসরকারি শিক্ষা খাতে কর্মরত বাঁধনের (ছদ্ম নাম) গল্পটি আবার ভিন্ন। তিনি মূলত সেই নীরব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, যারা চাকরি হারানোর ভয় এবং সামাজিক সম্মানের কথা চিন্তা করে কর্মক্ষেত্রের মানসিক নিপীড়ন মুখ বুজে সহ্য করেন। আমাদের সমাজ ও পেশাক্ষেত্রে মানসিক চাপ প্রকাশ করাকে এক ধরনের পেশাগত দুর্বলতা হিসেবে গণ্য করার যে সংস্কৃতি রয়েছে, তার কারণে অনেকেই মুখ খোলেন না। ভারতীয় উপমহাদেশের জনপ্রিয় চাকরি বিষয়ক পোর্টাল নকরি ডট কম-এর ২০ হাজার পেশাজীবীর ওপর চালানো এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ কর্মী মানসিক অবসাদে ভুগলেও এ সংক্রান্ত ছুটি চাইতে ভয় পান। চাকরি হারানোর সার্বক্ষণিক আতঙ্ক এই সৃজনশীল যুবকদের ভেতরে-ভেতরে সম্পূর্ণ ভেঙে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে করপোরেট সংস্কৃতি এখনও অন্ধের মতো কেবল উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার পেছনে ছুটছে। তবে বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ওয়েলনেস ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে উৎপাদনশীলতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় এবং কর্মীদের অনুপস্থিতির হার হ্রাস পায়। নীতিনির্ধারক ও করপোরেট ব্যবস্থাপকদের এটি অনুধাবন করতে হবে যে, মানসিক breaths বা স্বাস্থ্যের দেখভাল কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার একটি জুতসই কৌশল। করপোরেট নেতৃত্ব যত দ্রুত মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাকে তাদের মূল্যায়নের মাপকাঠি বানাবে, দেশের পেশাজীবী খাতের ভিত্তি ততই সুদৃঢ় হবে।
মন্তব্য করুন