রাফিউল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশিত: ৮ ঘন্টা আগে, ০৮:৪৯ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

আবেগ নয়, অগ্রাধিকার: ইরান সংকটে বাস্তববাদী চীন

ছবি: তরুণ কণ্ঠ

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই একটি প্রচলিত ধারণা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা বাড়ছে, ইরান দুর্বল হলে চীনও দুর্বল হবে। কারণ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানি তেলের বড় অংশ চীনা রিফাইনারিতে গেছে; উপরন্তু, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভাঙলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয় যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে চীন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তা আতঙ্কের নয়, বরং হিসাবি সংযমের।

চীনের দৃষ্টিতে সব সংকট এক নয়। এক ধরনের ধাক্কা হলো অভ্যন্তরীণ গণ-অস্থিরতা, যা শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং “আদর্শগত ভাইরাস” হয়ে ছড়াতে পারে। অন্যটি বহিরাগত সামরিক আঘাত, যা সহিংস হলেও “ঘটনা” হিসেবে ফ্রেম করা যায়, সার্বভৌমত্বের ভাষ্য দিয়ে মোকাবিলা করা যায়।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেইজিং সবচেয়ে বেশি ভয় পায় দেশের ভেতর থেকে ছড়ানো অস্থিরতাকে; বাইরের আঘাতকে সে নিন্দা করতে পারে, কিন্তু সেটিকে শাসনব্যবস্থার অস্থিরতার প্রমাণ হিসেবে দেখতে চায় না।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেলের বড় অংশ চলাচল করে। এই জলপথে বড় বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি চাপ বাড়বে, চীনের অর্থনীতিতে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে। তাই বেইজিং প্রকাশ্যে সংযমের আহ্বান জানায়, নাগরিকদের সরিয়ে নেয়, কূটনৈতিক ভাষ্য দেয়। কিন্তু লক্ষণীয়, চীন সামরিকভাবে জড়ায় না, কূটনৈতিক বিচ্ছেদও ঘটায় না। কারণ তার প্রধান কৌশলগত সম্পর্ক এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং তাইওয়ান ইস্যু। সেই বৃহত্তর সমীকরণে ইরান গুরুত্বপূর্ণ হলেও শীর্ষ অগ্রাধিকার নয়।

চীনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি মূলত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক; এটি পশ্চিমা প্রতিরক্ষা জোটভিত্তিক কাঠামোর মত নয়। বেইজিং প্রভাব চায়, কিন্তু সামরিক দায়বদ্ধতা নয়। তেল কেনা, অবকাঠামো বিনিয়োগ, জাতিসংঘে অবস্থানের প্রশ্নে চীন ইতিবাচক। তবে দেশটি কখনো যুদ্ধে সৈন্য পাঠাবেনা। এখানে একটি কাঠামোগত অসমতাও আছে। নিষেধাজ্ঞার সময় চীনেকে নিজ স্বার্থে ইরানের বেশি প্রয়োজন ছিল; চীনের বিকল্প জোগানদাতা আছে,সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে বেইজিংয়ের অবস্থান আবেগতাড়িত নয়; সে চায় স্থিতিশীল জ্বালানি প্রবাহ ও পূর্বানুমানযোগ্য বাণিজ্যিক পরিবেশ, তা শাসক অথবা দেশই হোক। 

মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক বিস্তার চীনের জন্যও ঝুঁকির। কারণ তা পূর্ব এশিয়ায় সামরিক কৌশল বদলে দিতে পারে। এ কারণেই বেইজিং পারমাণবিক চুক্তির কূটনৈতিক কাঠামোকে সমর্থন করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

অন্যদিকে এই যুদ্ধে চীনও পরোক্ষভাবে লাভবান হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে জড়িয়ে পড়ে এবং ওয়াশিংটনের সময় ও সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত থাকে, তবে ইন্দো-প্যাসিফিকে আপেক্ষিক কৌশলগত ফাঁক তৈরি হতে পারে; এতে চীন নীরবে সুবিধা পেতে পারে। তবে যুদ্ধ স্থায়ী না হলে ইরান দ্রুত স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনের দিকে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরী হলে চীন বাণিজ্যিকভাবে মানিয়ে নেবে; বড় পরিবর্তন ঘটবে না। তবে হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘ স্থবিরতা বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তবে সার্বিক বিবেচনায় নিজেরা সামরিক করলে লাভবান হবেনা চীন। এই যুদ্ধে চীনের হিসেবটা আবেগের নয়, অগ্রাধিকারের। প্রথমে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, তারপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর প্রতিযোগিতা, এরপর মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদাররা। ইরান গুরুত্বপূর্ণ, তবে আবশ্যিক নয়।

প্রশ্ন শুধু চীন ইরানের বন্ধু কি না এতে সীমাবদ্ধ নয়। বড় প্রশ্ন হলো, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতার গতি কতটা বদলাচ্ছে। বেইজিং আপাতত দেখছে, হিসাব করছে, এবং অপেক্ষা করছে। কারণ দেশটির কৌশল দীর্ঘমেয়াদি, স্তরবিন্যাসভিত্তিক।

মন্তব্য করুন