প্রকাশিত: ৯ ঘন্টা আগে, ০৭:৪৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
একটি জাতির মেরুদণ্ড যদি হয় শিক্ষা, তবে সেই মেরুদণ্ডকে সোজা ও শক্তিশালী রাখার রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্র সংস্কারের হাওয়া বইছে, তখন শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন বা সংস্কার কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের সংকট বিবেচনা করলে দেখা যায়, আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও আধুনিক যুগের চাহিদার মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই ব্যবধান ঘোচাতে হলে প্রথাগত চিন্তার বাইরে এসে সাহসী কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষানির্ভর। জিপিএ-৫ পাওয়ার উন্মাদনায় শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা হারিয়ে কেবল মুখস্থবিদ্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার যে নতুন শিক্ষাক্রমের কথা ভাবছে, সেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে 'ব্যবহারিক প্রয়োগ' বা 'স্কিল-বেসড' লার্নিংকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু পরীক্ষা নেওয়ার জন্য শিক্ষা নয়, বরং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের জন্য শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে, যাতে বছরের শেষে একটি তিন ঘণ্টার পরীক্ষা শিক্ষার্থীর পুরো বছরের মেধার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে না দাঁড়ায়।
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ শিক্ষকরা। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বা সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়নি। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে। একইসাথে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবর্তিত কারিকুলামের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নিয়মিত এবং উন্নত মানের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক যদি নিজে আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ না হন, তবে তার ছাত্ররা পিছিয়ে পড়তে বাধ্য।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, কিন্তু শিল্পকারখানাগুলো বলছে তারা যোগ্য কর্মী পাচ্ছে না। এই 'স্কিল গ্যাপ' দূর করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচি বর্তমান কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিমার্জন করতে হবে। একইসাথে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার জন্য বাজেট বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। গবেষণাগারগুলোর আধুনিকায়ন এবং দেশীয় সমস্যার সমাধানে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিবিড় যোগাযোগ তৈরি করতে হবে, যেন শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝেই বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা বা ইন্টার্নশিপের সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সবার জন্য বিএ বা এমএ ডিগ্রি নেওয়ার চেয়ে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া বেশি জরুরি। কিন্তু আমাদের সমাজে কারিগরি শিক্ষাকে এখনো কিছুটা নিচু চোখে দেখা হয়। এই মানসিকতা বদলাতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি করে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে এবং সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতাকে বাধ্যতামূলক করার কথা ভাবা যেতে পারে। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে হলে ভাষা শিক্ষা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।
শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান আমাদের এক জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। করোনাকালীন আমরা দেখেছি ডিজিটাল ডিভাইড বা প্রযুক্তির অসমতা কীভাবে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি স্কুলে হাই-স্পিড ইন্টারনেট এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নিশ্চিত করা। প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল উচ্চবিত্তের একচেটিয়া অধিকার না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার একক কোনো কর্তৃপক্ষের কাজ নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া যেখানে সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা যদি একটি বৈষম্যহীন, বিজ্ঞানমনস্ক এবং দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, তবে শিক্ষার বাজেটকে জিডিপির অন্তত ৪-৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে ২০৩০ বা ২০৪১ সালের বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে কতটা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
মন্তব্য করুন