নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫২ মিনিট আগে, ১২:৩২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

শহর থেকে গ্রাম—মাদকের বিস্তারে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি, নির্মূলে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর

দেশজুড়ে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। শহর থেকে গ্রাম, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রত্যন্ত জনপদ—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে মাদকের ব্যবহার ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের একটি অংশ মাদকের ঝুঁকিতে পড়ায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যে তৈরি হচ্ছে গভীর উদ্বেগ।

একসময় মাদককে মূলত সীমান্তবর্তী অঞ্চল কিংবা বড় শহরকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে এর প্রভাব দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও মাদক সহজলভ্য হয়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে দেশে প্রবেশের পর নানা কৌশলে এসব মাদকদ্রব্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও বিভিন্ন মামলার তথ্য থেকে জানা যায়।

মাদক বিস্তারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের তরুণ প্রজন্ম। স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মাদকের ক্ষতিকর প্রভাবে জড়িয়ে পড়ছে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। কৌতূহল, বন্ধুদের প্ররোচনা, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, অপরাধী চক্রের প্রভাব এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব অনেক তরুণকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কর্মজীবী মানুষের মধ্যেও মাদকের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পরিবহন খাতের চালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে মাদক ব্যবহারের অভিযোগও বিভিন্ন সময় সামনে আসে। এর ফলে শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নয়, জননিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ দেশের সীমান্ত এলাকা। সীমান্তের বিভিন্ন দুর্গম পথ ও রুট ব্যবহার করে চোরাচালানের মাধ্যমে মাদক দেশে প্রবেশের চেষ্টা চালানো হয়। পরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এসব মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উঠে আসে।

মাদক পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে থাকে। ফলে একটি চালান আটক বা কয়েকজন কারবারি গ্রেপ্তার হলেও পুরো সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সীমান্ত এলাকা, মহাসড়ক, বাস টার্মিনাল, বিভিন্ন পরিবহনকেন্দ্র, শহর ও গ্রামাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং সন্দেহভাজন কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

তবে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, একটি চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর অন্য একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি এর চাহিদা কমানোও জরুরি।

মাদক প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের আচরণ, বন্ধু নির্বাচন, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, অভিভাবক এবং তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা গেলে মাদকবিরোধী আন্দোলন আরও কার্যকর হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা। তাই এর সমাধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, সীমান্তে নজরদারি, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা, জনসচেতনতা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

একই সঙ্গে মাদকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি শুধু শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি। কারণ একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি সুস্থ জীবনে ফিরে এলে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজই উপকৃত হয়।

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। সীমান্ত থেকে শুরু করে শহর ও গ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে না দেখে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে দেখার সময় এসেছে।

মন্তব্য করুন