প্রকাশিত: ১৩ ঘন্টা আগে, ১১:৩৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেও অনেকে সৌদি আরবে যেতে পারছেন না। অন্যদিকে, রিয়াদে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আটকে পড়েছেন হাজারো বাংলাদেশি যাত্রী।
কবে ফ্লাইট চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে চাকরি, ভিসার মেয়াদ ও নিয়োগকর্তার শর্ত নিয়ে জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা করছেন প্রবাসীরা।
রোববার (১১ অক্টোবর) ঢাকা থেকে রিয়াদগামী একাধিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় কর্মস্থলে সময়মতো পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন তাঁরা।
বিমানবন্দরে আসা এক সৌদিপ্রবাসীর রোববার দুপুরে ছুটি শেষে সৌদি আরবে ফেরার কথা ছিল। আগেই টিকিট কেটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরবর্তী ফ্লাইট কখন ছাড়বে, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছিলেন না তিনি।
বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দাঁড়িয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ওই প্রবাসী বলেন, ‘হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। আমাকে যে কোনো মূল্যে সৌদি আরব যেতে হবে। সময়মতো যেতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। পরবর্তী ফ্লাইটের সিদ্ধান্ত জানানো হলে ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমত।’
রফিকুলের মতো অনেক প্রবাসীই এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে চাকরি ও ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় প্রাণহানি ও বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হওয়ার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এর ফলে সৌদি আরবের বিমান চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।
বিমানবন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটে অন্তত ১০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে ঢাকায় সৌদি আরবগামী প্রায় তিন হাজার যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, রিয়াদে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আটকা পড়েছেন প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি যাত্রী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে এরপর ফ্লাইট চলাচল কখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলো অবহিত করছে। যাত্রীদের নিজ নিজ বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার সময় নিশ্চিত হওয়ার পর বিমানবন্দরে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।
কর্মকর্তারা বলেন, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।
সৌদি আরবে পৌঁছাতে বিকল্প পথ খুঁজছেন অনেক যাত্রী। তবে সেখানেও মিলছে না নিশ্চয়তা। এক যাত্রী জানান, তিনি ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু তাঁর যাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন শুনছি, মুম্বাইয়ে যাদের ট্রানজিট, তাদের বোর্ডিং দেওয়া হচ্ছে না। মুম্বাই থেকে নাকি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
অন্যান্য যাত্রীরাও ঢাকা-মদিনা ও ঢাকা-জেদ্দা রুটে টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিকল্প রুটের টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে হচ্ছে। এসব পথে যাত্রা করেও শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে পৌঁছানো যাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
ভিসার মেয়াদ ও কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা যাত্রীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে অনেকের নিয়োগকর্তার সঙ্গে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে কেউ কেউ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা না করে বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসা যাত্রীরা নতুন করে বিপাকে পড়েছেন। অনেকে বাস, মাইক্রোবাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিমানবন্দরে এসেছিলেন। এখন তাঁদের সামনে প্রশ্ন—বাড়ি ফিরে যাবেন, নাকি ঢাকায় থেকে পরবর্তী ফ্লাইটের অপেক্ষা করবেন।
টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, অর্থ ফেরত পাওয়া কিংবা বিকল্প ফ্লাইটে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেককে বিমান সংস্থাগুলোর কাউন্টারে ছোটাছুটি করতে দেখা গেছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে।
এদিকে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার না করতে বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের সতর্ক করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ অক্টোবরও হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি বিমানবন্দর ব্যবহার নিয়ে নতুন করে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এতে সৌদি আরবের আকাশপথের নিরাপত্তা ও ফ্লাইট চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসী থেকে শুরু করে দেশে ফেরার জন্য রিয়াদে আটকে পড়া বাংলাদেশি—দুই পক্ষকেই এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
মন্তব্য করুন