তরুণ কণ্ঠ অনলাইন

প্রকাশিত: ৪ আগষ্ট, ২০২৬, ১২:১১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

বিডিআরসিএস ও আইএফআরসির জরিপ

হামের চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হাজারো পরিবার

দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হাম রোগে আক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছে হাজারো পরিবার। সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র, চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে প্রায় নয়-দশমাংশ পরিবারকেই ঋণের আশ্রয় নিতে হয়েছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)-এর যৌথ উদ্যোগে চালানো এই জরিপে দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে গিয়ে প্রতি দশ পরিবারের মধ্যে ছয়টিকেই ভাঙতে হয়েছে জমানো সঞ্চয়। গড়ে প্রতিটি পরিবারের ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার টাকা, কারও কারও ক্ষেত্রে এই অঙ্ক আরও বেশি। খরচ মেটাতে চার শতাংশ পরিবার বাধ্য হয়েছে সম্পদ বিক্রি করতে, আর প্রায় তিন শতাংশ নির্ভর করেছে অনুদানের ওপর।

শিশুরাই এই রোগের সবচেয়ে বড় শিকার হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে জরিপ থেকে। আক্রান্তদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশির বয়স চার বছরের কম, ১৯ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে, আর প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর হার মাত্র ৬ শতাংশ।

জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ, ৭৮ শতাংশ কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে, যাদের মাসিক আয় সীমাবদ্ধ ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। সন্তান বা পরিবারের অসুস্থ সদস্যের সেবায় দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটাতে গিয়ে অনেকেই হারিয়েছেন আয়ের উৎস, এমনকি চাকরিও।

অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াতেই শেষ ২০ হাজার টাকা

রংপুর থেকে আসা হাজেরা খাতুনের গল্প এই সংকটের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। গত জুনে ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন। এরই মধ্যে চিকিৎসাবাবদ তাঁর খরচ ছাড়িয়ে গেছে ৭০ হাজার টাকা।

তিনি বলেন, "সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও এর বাইরে অনেক খরচ থাকে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই আমাদের প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিদিন খাবার কিনতে হচ্ছে, বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষার খরচ দিতে হচ্ছে, সঙ্গে আরও নানা দৈনন্দিন ব্যয় রয়েছে। আমি এরই মধ্যে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেছি। আমার স্বামী সৌদি আরবে কাজ করেন, কিন্তু এই মাসে তিনি বেতন পাননি। এতে আমাদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।"

সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন ওষুধ

জরিপে অংশগ্রহণকারী সব পরিবারই আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে সবচেয়ে জরুরি চাহিদা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, এরপর রয়েছে পানি-স্যানিটেশন-স্বাস্থ্যবিধি সহায়তা (৩৩ শতাংশ) এবং খাদ্য সহায়তা (২২ শতাংশ)।

এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২ হাজার ৪০০টি পরিবারকে বেছে নেওয়া হয়েছে জরুরি নগদ সহায়তার জন্য—প্রতিটি পরিবার পাবে ১০ হাজার টাকা করে।

"স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি আর্থিক সংকটও"

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল কবির এম আশরাফ আলম এই পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, "এ মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, অনেক পরিবার শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, একই সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক সংকটেরও মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের জরুরি সাড়ার অংশ হিসেবে আমরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।"

বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "হামের এই স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার প্রভাব শুধু হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের অন্য সদস্যের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক পরিবার কঠিন আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। এই মূল্যায়নের ফল বলছে, জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা এবং শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা–দুটোই জরুরি। আমাদের কার্যক্রম অবশ্যই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।"

দেশব্যাপী চলমান হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারকে সহযোগিতা করছে বিডিআরসিএস, আইএফআরসি ও অন্যান্য অংশীজনদের সহায়তায়। এ ছাড়া কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি, টিকাদান কেন্দ্রে সহায়তা প্রদান এবং মানুষকে টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করার কাজে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক।

মন্তব্য করুন