প্রকাশিত: ৫ ঘন্টা আগে, ০৭:৪১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
রাত নামলেই টাঙ্গুয়ার হাওর যেন নীরবতার চাদরে ঢেকে যায়।দূর থেকে মনে হয়,জলরাশি ঘুমিয়ে আছে প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দে।অথচ সেই নীরবতার আড়ালেই কোথাও কোথাও জেগে ওঠে অবৈধ শিকারের আয়োজন।পানিতে নামানো হয় ইলেকট্রিক শক মেশিন,বিদ্যুতের প্রভাবে মুহূর্তেই অবশ হয়ে ভেসে ওঠে মাছ।তুলে নেওয়া হয় সহজেই।কিন্তু সেই শিকারের সঙ্গে নিঃশব্দে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পোনা,ডিম ও নানা জলজ প্রাণী—ধীরে ধীরে বিপন্ন হয় হাওরের জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য।
সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরে অভিযানে তিনটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক শকে মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ হওয়ার ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। প্রশ্ন উঠছে—হাওরের অন্ধকার রাতে যদি এভাবে বিদ্যুতের শক ছড়িয়ে পড়ে,তাহলে টাঙ্গুয়ার হাওরের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?ইলেকট্রিক শক মেশিন দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ টাঙ্গুয়ার হাওরে নতুন নয়। তবে সম্প্রতি অভিযানে শক দিয়ে মাছ ধরার সরঞ্জাম জব্দ হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।এটি যদি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা না হয়ে একাধিক বিলে ছড়িয়ে পড়া একটি চর্চা হয়,তাহলে তা হাওরের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা।
৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার দিবাগত রাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবীর নির্দেশনায় টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা রূপনগর আনসার ক্যাম্পের সদস্যরা তেকুইন্যার বেরবেরিয়া বিলে অভিযান চালান। এ সময় জেলেরা পালিয়ে গেলেও হাওরের বাঁধসংলগ্ন একটি উঁচু স্থান থেকে তিনটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক নেট জালসহ ইলেকট্রিক শকে মাছ শিকারের বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরে এসব সরঞ্জাম উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।গভীর রাতে নৌকা নিয়ে হাওরে নামে শিকারিরা। সঙ্গে থাকে ব্যাটারি-চালিত ইলেকট্রিক শক মেশিন। মেশিনের সঙ্গে সংযুক্ত ইলেকট্রোড পানিতে নামিয়ে বৈদ্যুতিক প্রবাহ প্রয়োগ করা হয়। এতে পানির নির্দিষ্ট অংশে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হলে তার মধ্যে থাকা মাছের স্নায়ুতন্ত্রে তীব্র প্রভাব পড়ে। মাছ সাময়িকভাবে অবশ বা অচেতন হয়ে ভেসে ওঠে। তখন সহজেই জাল বা হাত দিয়ে সেগুলো তুলে নেওয়া হয়।
রূপনগর গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক, যিনি নিজেকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন,জানান,রূপনগর-সংলগ্ন হাওরে তিনি ইলেকট্রিক শক মেশিন দিয়ে মাছ ধরতে দেখেছেন। তাঁর ভাষ্য,পানিতে শক দেওয়ার পর মাছ অচেতন হয়ে ভেসে ওঠে এবং পরে সেগুলো সংগ্রহ করা হয়।
তথ্যসূত্রে জানা যায়,তেকুইন্যা, বেরবেরিয়াসহ কয়েকটি বিলে প্রায় প্রতিরাতে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রিক শক মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এ তথ্য এবং মেশিনের সঠিক সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা গেলে প্রশ্ন আরও গুরুতর—রাতের আঁধারে এসব মেশিন হাওরে ঢুকছে কীভাবে? কারা এগুলো ব্যবহার করছে? আর সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত নজরদারির মধ্যেও এসব কর্মকাণ্ড কীভাবে চলছে?এখানেই সামনে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—জবাবদিহি। টাঙ্গুয়ার হাওরের নির্দিষ্ট এলাকায় যাঁদের সংরক্ষণ ও নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁদের কাছে জানতে হবে: কোন এলাকায় কখন টহল হয়েছে? কতজন সদস্য দায়িত্বে ছিলেন? টহলের সময় কী পাওয়া গেছে? কোথাও অবৈধ মাছ শিকারের তথ্য পাওয়া গেলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? টহল ও অভিযানের প্রতিবেদন কি নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে?কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া গাফিলতির অভিযোগ তোলা নয়; বরং দায়িত্ব পালনের বাস্তব চিত্র সামনে আনাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংরক্ষণ মানে শুধু অভিযানের রাতে কয়েকটি সরঞ্জাম জব্দ করা নয়। সংরক্ষণ মানে নিয়মিত টহল, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা,তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ কর্মকাণ্ডের গতিপথ নজরে রাখা এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। কোনো এলাকায় বারবার একই অভিযোগ উঠলে সেখানে নজরদারি কেন বাড়ানো হয়নি—সেটিও জবাবদিহির অংশ।
এদিকে ৫ অক্টোবর তাহিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিএমএসআর আলিফের নেতৃত্বে হাওরে আরও একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় সাতটি কোনাজাল ও কারেন্ট জাল জব্দ করা হয় এবং অবৈধভাবে মাছ ধরার দায়ে ছয়জনকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিযান শেষে অবৈধ জাল কিংবা ইলেকট্রিক শক মেশিন আবার একই এলাকায় ফিরে আসছে কি না, সেটিও নজরদারিতে রাখা জরুরি।
এ বিষয়ে সিএনআরএসের প্রকল্প উন্নয়ন কর্মী ছাইফুল চৌধুরী বলেন,বিদ্যুৎ দিয়ে মাছ ধরা শুধু অবৈধ নয়,এটি জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।এ পদ্ধতিতে বড় মাছের পাশাপাশি পোনা, ডিম ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে হাওরের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি বলেন,একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরাও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত বা প্রাণ হারাতে পারেন। তাই এটি মৎস্যসম্পদ রক্ষার পাশাপাশি জননিরাপত্তারও বিষয়।তাঁর মতে, প্রথমে এ কাজে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর সচেতনতা ও সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে তাদের এ পদ্ধতি থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সচেতন করার পরও কেউ একই কাজ চালিয়ে গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।ছাইফুল চৌধুরী আরও বলেন,শুধু অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাবে না। জীবিকার প্রয়োজনে যারা এ কাজে জড়িত, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,মৎস্যজীবী যুবসমাজ ও সচেতন নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে গ্রামভিত্তিক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
এ বিষয়ে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন,ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ ধরা শুধু মাছের জন্য নয়,পুরো হাওরের জলজ প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এতে মাছের পাশাপাশি পোনা,ব্যাঙ, জলজ কীটপতঙ্গসহ নানা প্রাণী মারা যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়।
তিনি বলেন,এভাবে চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে মাছের প্রাকৃতিক মজুত কমে যাবে এবং হাওরের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। তাই শুধু মাছ রক্ষার জন্য নয়,পুরো জলজ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে ইলেকট্রিক শকে মাছ ধরা বন্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাওর ও জলাভূমি গবেষক কৃষিবিদ মো. আল-ফাহাদ বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরে ইলেকট্রনিক ফিশিং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে মাছ শিকারের ফলে শুধু বড় মাছ নয়, পোনা,ডিমসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি হাওরের মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই টাঙ্গুয়ার হাওরের মৎস্যসম্পদ ও প্রতিবেশ রক্ষায় ইলেকট্রনিক ফিশিং দ্রুত বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এখন তাই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—ইলেকট্রিক শক মেশিনগুলো কোথা থেকে আসছে? কারা ব্যবহার করছে? রাতে কোন কোন বিলে এগুলো যাচ্ছে? সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের টহল কতটা নিয়মিত? টহলের তথ্য কোথায়? বারবার অভিযোগ ওঠা এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে কি? জব্দ হওয়া সরঞ্জামের মালিক বা ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আর অভিযান পরিচালনার পর একই অপরাধ যাতে ফিরে না আসে,সে জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার জন্য নয়;বরং টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণের দায়িত্বটি কতটা কার্যকরভাবে পালন হচ্ছে,তা নিশ্চিত করার জন্য। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা মানে তাঁদের অভিযুক্ত করা নয়—বরং দায়িত্ব পালনের প্রমাণ,টহল রেকর্ড,অভিযান প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করা। কোথাও ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, আর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হলে সেটিও তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওর কোনো সাধারণ জলাভূমি নয়;এটি একটি জীবন্ত জলজ প্রতিবেশ।তাই একটি মেশিন জব্দ,কয়েকটি জাল উদ্ধার কিংবা কয়েকজনকে জরিমানা—এসব দিয়ে লড়াই শেষ হওয়ার নয়। আসল সাফল্য তখনই, যখন রাতের অন্ধকারে অবৈধ শিকার বন্ধ হবে এবং সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রতিটি স্তরে থাকবে নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।কারণ আজ পানিতে যে বিদ্যুতের শক দেওয়া হচ্ছে, তার অভিঘাত শুধু একটি রাতের মাছ শিকারে থেমে থাকে না; এর প্রভাব পড়তে পারে টাঙ্গুয়ার হাওরের আগামী দিনের জলজ জীবনেও।
মন্তব্য করুন