রিয়াদ হোসাইন লাকসাম-মনোহরগঞ্জ (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৪ ঘন্টা আগে, ০৭:৩২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

মনোহরগঞ্জে রাস্তার কাজ ধীরগতিতে, দুর্ভোগে ৪ হাজার মানুষ

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর থেকে খালপাড় হয়ে গজরাপাড়া পর্যন্ত সড়কটির নির্মাণকাজ চলছে ধীরগতিতে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের ধীরগতিতে হতাশ হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী। বর্ষায় কাদাপানি আর খানাখন্দে ভরা সড়কে চলাচল করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন অন্তত চার হাজার মানুষ। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। সড়কটির নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, যথাযথ তদারকির মাধ্যমে দ্রুত ও মানসম্মতভাবে সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করা হোক।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকেই এ এলাকার মানুষ একটি ভালো সড়কের জন্য অপেক্ষা করছেন। অবশেষে সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের ধীরগতির কারণে তাঁদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হচ্ছে না। বর্ষার আগে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বালু ফেলে রাখায় চলাচলে আরও ভোগান্তি বেড়েছে। বৃষ্টিতে সড়কটি কাদায় একাকার হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, কৃষকদের ফসল পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

গজরাপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, ইসলামপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম এ সড়ক। এর পাশে রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান-মোস্তফা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসহ ৮ থেকে ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছাড়াও ছোট-বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও কৃষকেরা প্রতিদিন এ সড়ক ব্যবহার করেন।

গজরাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মুমিন বলেন, রাস্তার দুরবস্থার কারণে এলাকার মানুষের সামাজিক জীবনেও প্রভাব পড়ছে। ভালো সড়ক না থাকায় অনেক সময় ছেলেমেয়েদের বিয়ের সম্বন্ধও ভেঙে যায়। অসুস্থ রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি সড়কটি সঠিকভাবে নির্মাণের দাবি জানান।

ইসলামপুর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা শুকর আলম বলেন, “বর্ষা আসার আগমুহূর্তে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে বালুর স্তূপ ফেলে রাখা হয়। এতে আমাদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ বছর ধান কেটে বাড়িতে আনতেও অনেক কষ্ট হয়েছে। ট্রাক্টরে করে বালু ফেলে রাখায় মানুষের হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”

খালপাড় এলাকার শাহজাহান সিরাজ ও নাজমা বেগম বলেন, “এই রাস্তা দিয়ে অসুস্থ রোগী নিয়ে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। বাজার থেকে সদাই নিয়ে বাড়ি ফেরাও কঠিন। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে রিকশাচালকেরা আসতে চান না। এলেও কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিতে হয়। আমরা দ্রুত রাস্তাটির নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।”

স্থানীয় শিশু শিক্ষার্থী ইসরাফিল ইসলাম শান্ত জানায়, একটু বৃষ্টি হলেই সড়কে কাদাপানি জমে যায়। তখন স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। কাদায় জামাকাপড় ও বই-খাতা নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

গজরাপাড়া উত্তরপাড়ার আমির হোসেন ও আব্দুল বাতেনসহ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে আমরা এই রাস্তার দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। কত নেতা এলেন, কত নেতা গেলেন, কিন্তু আমাদের রাস্তার দুর্ভোগের অবসান হলো না। এবার রাস্তার কাজ শুরু হলেও ধীরগতির কারণে আমরা হতাশ। সংসদ সদস্য আবুল কালাম ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সরাসরি তদারকিতে দ্রুত এবং মানসম্মতভাবে কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।”

স্থানীয় হকার অর্জুন ঘোষ বলেন, “আমরা চাল-ডাল চাই না, চাই একটি ভালো রাস্তা। রাস্তাটি নির্মাণ করা হলে আমাদের উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারব। এতে আমাদের উপার্জন বাড়বে, পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারব।”

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান-মোস্তফা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, “স্বাধীনতার পর এই প্রথম রাস্তাটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি এলাকাবাসীর জন্য অত্যন্ত আনন্দের খবর। কিন্তু কাজ শুরুর পর কিছুদিন যেতে না যেতেই ঠিকাদারের লোকজনকে আর দেখা যায়নি। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এভাবে কাজ চলতে থাকলে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।”

গজরাপাড়া এলাকার আমান উল্লাহ ও আবু আজম বলেন, “ঠিকাদার আসে, ঠিকাদার যায়, কিন্তু রাস্তাটির নির্মাণকাজ শেষ হয় না। আমরা চাই, সংসদ সদস্য আবুল কালাম ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ তদারকিতে অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তাটির কাজ শেষ হোক। কোনোভাবেই যেন নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা না হয়।”

এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, ইসলামপুর থেকে খালপাড় হয়ে গজরাপাড়া পর্যন্ত ১ হাজার ৬১৫ মিটার দীর্ঘ ও ১০ ফুট প্রশস্ত সড়কটি পাকা করতে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মদিনা কনস্ট্রাকশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। বর্ষার কারণে কিছুদিন কাজ করার পর তা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তিনি বলেন, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উপঠিকাদার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বর্ষার কারণে কাজ শুরু করেও বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বর্তমানে আবার কাজ শুরু হয়েছে। এখন সাব-বেইজের কাজ চলছে। আশা করছি, আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারব। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সঠিক নয়। আমরা মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী দিয়েই কাজ করছি।”

দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে এখন সড়কটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন এলাকাবাসী। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মতভাবে সড়কটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে। এতে কয়েক হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।

 

মন্তব্য করুন