প্রকাশিত: ৮ ঘন্টা আগে, ১২:৫৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নওগাঁর মান্দা উপজেলার ‘দক্ষিণ শ্রীরামপুর আইজান বেওয়া নূরানী হাফেজিয়া লিল্লাহ বোর্ডিং মাদ্রাসা ও এতিমখানা’র প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমি দখল, ধানি জমি কেটে পুকুর খনন, এসটিডব্লিউ (শ্যালো টিউবওয়েল) স্থাপন এবং কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল ও সাবেক পরিচালনা কমিটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগে প্রশাসনিক দপ্তরে আবেদন ও আদালতে মামলা হলেও সুরাহা মেলেনি বলে দাবি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাদ্রাসার ধানি জমির একাংশ ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে কেটে বিশাল পুকুরে রূপান্তর করা হয়েছে। অন্য অংশে স্থাপন করা হয়েছে একটি গভীর নলকূপ, যা বর্তমানে দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। এ ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে এলাকার দুই দানশীল নারী আয়জান বেওয়া ও রহিমন বেওয়া গোবিন্দপুর মৌজার হাল ৪০১ নম্বর খতিয়ানের সাড়ে তিন বিঘা জমি মাদ্রাসার নামে দানপত্র করেন। গত ৪৫ বছর ধরে ওই জমির আয় থেকে এতিম ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের পরিচালনা ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছিল।
তবে ২০২১ সালে তৎকালীন পরিচালনা কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ বছরে ৭০ হাজার টাকায় জমিটি লিজ নেন। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আলহাজ জাহাঙ্গীর আলম প্রভাব খাটিয়ে লিজের মূল কাগজপত্র নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন এবং কমিটির অনুমোদন ছাড়াই জমিটি স্থানীয় ইটভাটা মালিক নাজমুল হক মিলনের কাছে হস্তান্তর করেন।
অভিযোগ রয়েছে, নাজমুল হক মিলন ভূমি অফিসের অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজশে প্রকৃত তথ্য গোপন করে জমিটি নিজের নামে নামজারি (খারিজ) করে নেন। পরে মোটা অঙ্কের টাকায় তিনি জমিটি এক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীর কাছে বিক্রি করেন। ২০২৪ সালের মে মাসে ওই প্রবাসীর অনুসারীরা পাকা ধান কাটতে গেলে এলাকায় সংঘর্ষের উপক্রম হয় এবং পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করেন আব্দুল মালেক আকন্দ।
পরবর্তীতে নবগঠিত পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নামজারি বাতিলের আবেদন জানান। বিবাদীপক্ষ অনুপস্থিত থাকায় তৎকালীন এসিল্যান্ড নামজারি বাতিলের একতরফা নির্দেশ দিয়ে পুনঃতদন্তের আদেশ দেন। তবে সেই তদন্ত এখনও সম্পন্ন হয়নি।
বর্তমান কমিটির অভিযোগ, তদন্তে বিলম্বের সুযোগে দখলদাররা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ফেলেছে। ৪০১ নম্বর খতিয়ানের ১৩৪৪ নম্বর দাগের ধানি জমি কেটে পুকুর খনন এবং ৪০২ নম্বর খতিয়ানের ১২৯৩ নম্বর দাগে এসটিডব্লিউ স্থাপন করা হয়েছে। এতে জমির প্রাক-অবস্থা পরিবর্তিত হওয়ায় আইনি জটিলতা বাড়ছে।
এদিকে জমি নিয়ে বিরোধে একের পর এক মামলা হওয়ায় মাদ্রাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিপক্ষ আলতাফ হোসেন বিভিন্ন সময় পরস্পরবিরোধী দাবি তুলে হয়রানিমূলক মামলা করছেন। সম্প্রতি আদালত একটি মামলা খারিজ করলেও গাছ কাটার অজুহাতে মাদ্রাসা কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে আরেকটি জিআর মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা তদন্তাধীন।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা ও প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ বলেন, “এটি এতিম শিশুদের সম্পত্তি। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েও প্রতিকার পাচ্ছি না। চলতি মৌসুমে জমিতে যেতেও আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ইটভাটা ব্যবসায়ী নাজমুল হক মিলনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে আলতাফ হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “উল্লেখিত দাগে মাদ্রাসার কোনো জমি আছে কিনা তা জানা নেই। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারলে আমরা জমি ছেড়ে দেব।”
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি রাশেদ ইকবাল বলেন, “বিগত কমিটির অপব্যবহারের কারণেই এই সম্পত্তি হাতছাড়া হয়। আমরা এতিমখানার জমি উদ্ধার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম জানান, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষের দাবি, এতিমখানার এই সম্পত্তি রক্ষায় জেলা ও উপজেলা ভূমি প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে মাদ্রাসাটির অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে।
মন্তব্য করুন