রাফিউল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশিত: ১৬ ঘন্টা আগে, ১২:৪৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ক্ষমতাহীন এক পদের অসীম প্রভাব: কে হচ্ছেন জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব

জাতিসংঘের মহাসচিব, যার হাতে নেই কোনো সেনাবাহিনী, নেই কোনো রাষ্ট্র শাসনের ক্ষমতা, এমনকি কোনো সরকারকে বাধ্য করারও অধিকার নেই, তবুও বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এই পদটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। যুদ্ধ ঠেকানো থেকে শান্তিচুক্তি গঠন, ইতিহাসে এই পদে আসীন ব্যক্তিরা বারবার প্রমাণ করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা না থাকলেও নৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে ছাপ রাখা সম্ভব।

আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ শেষ হচ্ছে। পরদিনই, অর্থাৎ নতুন বছরের প্রথম দিনে, দায়িত্ব নেবেন জাতিসংঘের দশম মহাসচিব। এই পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন জাতিসংঘ তার প্রতিষ্ঠাকালীন কর্তৃত্ব ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিমূলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী মহাসচিবকে বলা হয়েছে সংস্থার "প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা", রাজনৈতিক নেতা নয়। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, এই পদই বদলে দিয়েছে সংকট মোকাবিলার ধরন। নরওয়ের ট্রিগভে লি ছিলেন প্রথম মহাসচিব, যিনি কোরিয়ান যুদ্ধ নিয়ে সোভিয়েত বিরোধিতার মুখে ১৯৫২ সালে পদত্যাগ করেন। তবে পদটির প্রকৃত রাজনৈতিক রূপ দেন সুইডেনের দ্যাগ হ্যামারশোল্ড, যিনি "প্রতিরোধমূলক কূটনীতি"র ধারণা প্রবর্তন করেন। কঙ্গো সংকট সমাধানে যাওয়ার পথে ১৯৬১ সালে বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়, যার পিছনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে। মরণোত্তর নোবেল শান্তি পুরস্কার পান তিনি।

নিরাপত্তা পরিষদ যখনই বিভক্ত হয়েছে, তখনই মহাসচিবরা মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটে হ্যামারশোল্ড প্রথম সশস্ত্র শান্তিরক্ষা মিশন গঠন করেন। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা করেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুইয়ার। আর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজা যুদ্ধ নিয়ে গুতেরেস সনদের বিরল অনুচ্ছেদ ৯৯ প্রয়োগ করেন, যা কয়েক দশকে প্রথম। নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ভেটো দেয়, আর ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত গুতেরেসকে পদত্যাগের আহ্বান জানান।

কে হবেন পরবর্তী মহাসচিব, তা নির্ধারণে কাজ করে তিনটি অলিখিত রীতি। প্রথমত, আঞ্চলিক আবর্তন।  সাম্প্রতিক পাঁচ মহাসচিব এসেছেন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে; এবার লাতিন আমেরিকার পালা বলে অনেকে মনে করছেন, কারণ ১৯৯১ সালের পর থেকে ওই অঞ্চলের কেউ এই পদে আসেননি। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া) কখনো নিজেদের নাগরিককে প্রার্থী করে না। তৃতীয়ত, প্রার্থীকে অবশ্যই সব স্থায়ী সদস্যের সমর্থন পেতে হয়, একটি ভেটোই যথেষ্ট বাদ পড়ার জন্য, যেমনটি ঘটেছিল মিসরের বুত্রোস বুত্রোস ঘালির ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালে।

এবারের নির্বাচনে ছয়জন প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের। চিলির মিশেল বাশেলে, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি, কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বার্কেট এবং সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাকি সাল। ছয়জনের মধ্যে চারজনই নারী, উল্লেখযোগ্য এই কারণে যে, জাতিসংঘের ৮১ বছরের ইতিহাসে এই শীর্ষ পদে এখনো কোনো নারী আসীন হননি।

নির্বাচন প্রক্রিয়াও দীর্ঘ ও বহুস্তরীয়।  ২০২৫ সালের নভেম্বরে মনোনয়ন আহ্বান দিয়ে শুরু হয়ে, জুলাইয়ে প্রকাশ্য সাক্ষাৎকার, নিরাপত্তা পরিষদের গোপন জরিপ ভোট, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সুপারিশ এবং সবশেষে সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যের ভোটে চূড়ান্ত অনুমোদন, যা ইতিহাসে কখনো প্রত্যাখ্যাত হয়নি।

নতুন মহাসচিবকে স্বাগত জানাবে এক গভীর সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র, যা নিয়মিত বাজেটের ২২ শতাংশ জোগান দেয়, তার বকেয়া পরিশোধ স্থগিত রাখায় ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ১৫৭ কোটি ডলারে। এর জেরে ২০২৬ সালের নিয়মিত বাজেট আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি কমাতে হয়েছে, কর্মী ছাঁটাই হয়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। জানুয়ারিতে গুতেরেস সতর্ক করেছিলেন, জুলাইয়ের মধ্যেই সংস্থাটির তহবিল ফুরিয়ে যেতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেস্কোসহ ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘ বডি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। যে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রধান স্থপতি ছিল, আজ সেই একই দেশ এই ব্যবস্থার জন্য অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।  গাজা ও সুদানে গণহত্যা ঠেকাতে ব্যর্থতা, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ-আটক, এবং ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ যুদ্ধ, এসবই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এমন এক টালমাটাল বাস্তবতায়, ক্ষমতাহীন এই পদের নতুন অধিকারীর সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু কূটনৈতিক নয়, জাতিসংঘের অস্তিত্ব রক্ষারও।

মন্তব্য করুন