প্রকাশিত: ৪৩ মিনিট আগে, ১২:২৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টা ১৮ মিনিটের দিকে তিনি বাংলায় ভাষণ শুরু করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর প্রথম বক্তব্য।
প্রায় ১৭ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক সংঘাত, নিরস্ত্রীকরণ, অভিবাসন, শান্তিরক্ষা, অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
ভাষণে ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো বিরোধের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।
তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানে নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকেই তিনি সংকটের সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জলবায়ু ন্যায্যতা, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রত্যাশা জানান।
ভাষণে তিনি বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি, ক্লিন ও সোলার এনার্জির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা-খরা মোকাবিলায় সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সরকার দেশ পুনর্গঠনে রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—‘থ্রি-আর’ কৌশল অনুসরণ করছে।
তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথাও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। নারীদের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যন্ত বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এ ছাড়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফার্মার্স কার্ড’, ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও ‘ই-হেলথ কার্ড’-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব কার্ডকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে বিশ্ব প্রবেশ করছে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা যেন সব দেশের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি।
ডিজিটাল বিভাজন যাতে ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
জাতিসংঘের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারের জন্য কার্যকর নীতিমালা গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ ভাষণের মাধ্যমে তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিলেন। এর আগে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন।
ভাষণের শেষ দিকে তারেক রহমান একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমঅধিকারভিত্তিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
মন্তব্য করুন