প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:৪৩ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে জাহাজ কাটার সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একাধিক শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় স্টেশন রোড এলাকার ওই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজের অভ্যন্তরে কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনার পর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বিএসবিআরএর সদস্য সচিব নাজমুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে তরুণ কণ্ঠকে বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মোট তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ আগস্ট বিএসবিআরএর প্রেসিডেন্ট মো. মহসিন চৌধুরীর স্বাক্ষরিত দাপ্তরিক স্মারকের মাধ্যমে পাঁচ সদস্যের একটি কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিএসবিআরএর টেকনিক্যাল উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিএসবিআরএর উপদেষ্টা নাঈম শাহ ইমরান, টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট ক্যাপ্টেন সিরাজুল মওলা এবং এইচআর শিপ ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান। সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন বিএসবিআরএর সচিব নাজমুল ইসলাম।
কমিটিকে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকেও বিষয়টি দাপ্তরিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর শিপইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে জাহাজ কাটার আগে যথাযথভাবে গ্যাস পরীক্ষা ও গ্যাস-ফ্রি সনদ যাচাই করা হয়েছিল কি না, জাহাজের বদ্ধ অংশে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল কি না, শ্রমিকরা ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) ব্যবহার করছিলেন কি না এবং কাটিংয়ের সময় নিরাপত্তা তদারকি যথাযথ ছিল কি না, এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার কথা।
শিপ ব্রেকিং শিল্পে পুরোনো জাহাজের অভ্যন্তরীণ অংশে কাটিংয়ের কাজ ঝুঁকিপূর্ণ। জাহাজের বদ্ধ কক্ষে অবশিষ্ট দাহ্য বা বিষাক্ত গ্যাস থাকলে কাটিংয়ের সময় তা বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড বা বিষক্রিয়ার মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এ কারণে কাটিংয়ের আগে গ্যাস পরীক্ষা, ‘গ্যাস-ফ্রি’ সনদ যাচাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রশিক্ষিত শ্রমিক ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির সাবেক যুগ্ন মহাসচিব অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী বলেন, স্বজনদের কাছে একজন শ্রমিকের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের উপার্জন, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ। তাই আহতদের সুচিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের যথাযথ সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা দরকার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্ত কমিটি গঠন করাই শেষ কথা নয়। তদন্তে নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন, অবহেলা কিংবা ব্যবস্থাপনাগত কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তে উঠে আসা সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন না করলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাবে।
ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের দুর্ঘটনা তাই শুধু একটি ইয়ার্ডের ঘটনা নয়; এটি সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন তিন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছেন শ্রমিক, স্বজন ও শিপইয়ার্ড সংশ্লিষ্টরা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী ছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি বা গাফিলতি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তদন্তেই তার উত্তর মিলবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
মন্তব্য করুন