নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩৩ মিনিট আগে, ০৬:৪৮ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

মির্জা আজমের ডিও লেটারে পদায়ন ও দুর্নীতি: ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আতাহারকে নিয়ে বিতর্ক ও সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ

 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রশাসনিক অনিয়ম, কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ এবং নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার অতীত পদায়ন, রাজনৈতিক সুপারিশ এবং বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদে পদায়নের জন্য মো. শহীদ আতাহার হোসেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের ডিও (আধাসরকারি) লেটার নিয়েছিলেন।

জানা যায়, ২০২২ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের কাছে পাঠানো এক আধাসরকারি পত্রে মির্জা আজম আতাহার হোসেনকে পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদে পদায়নের জন্য জোর সুপারিশ করেন। ওই পত্রে তিনি উল্লেখ করেন, আতাহার হোসেন তার নিজ জেলার বাসিন্দা এবং সুরক্ষা সেবা বিভাগের অধীন ফায়ার সার্ভিসের ১১টি মডার্ন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তাকে "মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একজন নিবেদিত কর্মকর্তা" হিসেবে উল্লেখ করে শূন্য থাকা পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদে পদায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।

এদিকে সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রশাসনিক অনিয়ম, কেনাকাটায় দুর্নীতি এবং কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাংবাদিক হাফিজুর রহমান শফিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করা হয় এবং পরে শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখায়।

অভিযোগ অনুযায়ী, সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী মহল দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে সক্রিয় হয়ে ওঠে। শাহবাগ থানার এসআই জিয়াউলের নেতৃত্বে একটি পুলিশ দল সাংবাদিক শফিককে তার কর্মস্থল থেকে বাসার কাছাকাছি মগবাজার এলাকায় আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

সাংবাদিক সমাজ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এবং মানবাধিকারকর্মীরা ঘটনাটিকে স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাকস্বাধীনতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের দাবি, প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা উচিত ছিল। তদন্তের আগেই একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের সাংবাদিকদের মধ্যে এ ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক লিখেছেন, কোনো সংবাদ প্রকাশের পর তার সত্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে দ্রুত মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য অশনিসংকেত।

এদিকে মো. শহীদ আতাহার হোসেনের বিরুদ্ধে আরও নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য পরিচালিত হয়েছে। নিয়োগ কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রশাসনিক অবস্থান ব্যবহার করে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদের দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে তিনি বেপরোয়া নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।

প্রতিবেদনে সিরাজগঞ্জের এক ফায়ার স্টেশনের চালকের মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই চালকের মাধ্যমে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হলেও নিয়োগে কেউ সফল হয়নি। পরবর্তীতে পাওনাদারদের চাপ ও মানসিক অশান্তির কারণে ওই চালক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তা ও নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার অপচয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ লাইসেন্স ফি বৃদ্ধি করে জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং ডিও লেটারের মাধ্যমে লোভনীয় পদ বাগিয়ে নেওয়ার ঘটনাও মো. শহীদ আতাহার হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর অন্যতম।

মন্তব্য করুন