প্রকাশিত: ৫ ঘন্টা আগে, ১২:২৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
এলভিরা মেনেন্দেজ গত রাতে জিমনেশিয়ামে খুব কমই ঘুমাতে পেরেছেন। কারণ স্থানীয় পৌরসভার জিমনেশিয়ামটি তার নিজের বাড়ির মতো নয়।
মাদ্রিদের উপকণ্ঠের চাপিনেরিয়া গ্রামের বাসিন্দা এলভিরা মেনেন্দেজ বলেন ‘এখানে কুকুর আছে, মানুষ নাক ডাকছে।’ শুক্রবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের দাবানল থেকে বাঁচতে তাকে নিজ বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
আরও প্রায় ২০০ মানুষের মতো এলভিরাও আশ্রয় নিয়েছেন ভিলাভিসিওসা দে ওদোনের একটি বড় জিমনেশিয়ামে। জায়গাটি রাজধানীর উপকণ্ঠে তার বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে।
মাদ্রিদের গ্রামাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানলের ভয়াবহ আগুন থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেও শনিবার সকালে আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল। পরে বাতাসের কারণে ধোঁয়া কিছুটা পরিষ্কার হয়।
প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ঐতিহাসিক এল এসকোরিয়াল মঠ ধোঁয়ায় ভরা ধূসর কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায়। কাছের ছোট শহর ব্রুনেটের মেয়র মার নিকোলাস বলেন, আগুন ‘সম্ভব সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে’। ওই শহর প্রায় ১০০ জন বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘অগ্রাধিকার ছিল মানুষের জীবন রক্ষা করা।’ তবে একই সঙ্গে তিনি এই আগুনের কারণে সৃষ্ট ‘বিশাল প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন।
ভিলাভিসিওসা দে ওদোনের জিমনেশিয়ামে স্বেচ্ছাসেবীরা শিশুদের খেলাধুলা ও রং করার কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, আগের রাতে খাটিয়ায় ঘুমানো আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করেন অনেকে।
এলভিরা মেনেন্দেজ বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবীরা আমাদের খুব ভালোভাবে দেখাশোনা করছেন। আমাদের কম্বল দেওয়া হয়েছে ও গোসলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।’
৮০ বছর বয়সী এই নারী আরও বলেন, ‘আমি জীবনে কখনো এমন কিছু দেখিনি।’
আগুন যখন এগিয়ে আসছিল, তখন তার মনে হয়েছিল তিনি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারেন। শনিবার পর্যন্ত এই দাবানলে ২৫ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। মাদ্রিদ অঞ্চল ও আভিলা প্রদেশে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
৬১ বছর বয়সী গৃহ পরিচর্যাকারী ভিক্টোরিয়া হুরতাদোকেও চাপিনেরিয়া থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে। তিনি প্রতিদিন যে বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তির দেখাশোনা করেন, তাকেও সঙ্গে নিয়ে বের হতে হয়েছে।
তারা দুজনই শুধু একটি করে ছোট ব্যাগ নিতে পেরেছিলেন। ওই ব্যাগে ছিল কিছু কাপড় ও প্রয়োজনীয় ওষুধ। হুরতাদো এএফপিকে বলেন, ‘তারা আমাদের স্বাগত জানিয়েছে।’ তবে কবে তিনি আবার নিজের বাড়িতে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
তবে তিনি আশাবাদী। তার আশা, পরিস্থিতির উন্নতি হবে, কারণ ‘দমকলকর্মীরা আগুন নেভাতে দিন-রাত কাজ করছেন।’
-ঝোপঝাড় ও অব্যবস্থাপনা-
ফ্রান্স ও স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ দাবানলের পেছনে রয়েছে খরা ও মে মাস থেকে পশ্চিম ইউরোপে আঘাত হানা একের পর এক রেকর্ড তাপপ্রবাহ, আর এ সব কারণে বন ও উদ্ভিদভূমি আরও সহজে দাহ্য হয়ে উঠেছে।
আন্তোনিও-লুইস রদ্রিগেস তার ছেলের সঙ্গে ভিলাভিসিওসা দে ওদোনের ক্রীড়া হলে রাত কাটিয়েছেন। তিনি শুধু পরনের কাপড় নিয়েই বাড়ি ছেড়েছেন। এখন তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো নিজের কুকুরটিকে নিয়ে, যাকে তিনি সান মার্টিন দে ভালদেইগ্লেসিয়া গ্রামের উপকণ্ঠের খামারে রেখে এসেছেন। ওই এলাকাও খালি করে দেওয়া হয়েছে। ৪৮ বছর বয়সী রদ্রিগেস এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিনি কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে বলেন, আশপাশের গ্রামাঞ্চলের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখতে তারা যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি।
তিনি বলেন, ‘এই শীতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে; ফলে ঘাস ও ঝোপঝাড় অনেক বেশি বেড়ে গেছে।’ একই সঙ্গে স্পেনে অনেক খামার পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়েও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
তার মতে, এর ফলে পতিত জমিগুলোর অবস্থা ‘অত্যন্ত খারাপ’ হয়ে গেছে এবং তাপে শুকিয়ে যাওয়া গাছপালার কারণে সামান্য স্ফুলিঙ্গেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
রদ্রিগেস জানান, ঘাস বেশি বেড়ে গেলে তিনি নিজের জমিতে ভেড়া ছেড়ে দিতেন, যাতে তারা অতিরিক্ত গাছপালা খেয়ে পরিষ্কার করে দেয়। তাদের চারণের কারণে তার খামার এখনো টিকে আছে বলে তিনি মনে করেন, যদিও আশপাশের অনেক জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রদ্রিগেস বিশ্বাস করেন, পাহাড়ি এলাকায় আরও বেশি ছাগল ও ভেড়ার পাল রাখা হলে দাবানল নিয়ন্ত্রণে ‘অনেক বড় ভূমিকা’ রাখা সম্ভব।
মন্তব্য করুন