প্রকাশিত: ৮ ঘন্টা আগে, ০৬:৩৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
কুমিল্লা নগরীর সার্বিক উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার মান বাড়াতে নানা বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাবনা তুলে ধরে সিটি করপোরেশন প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে কুমিল্লার নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন নাগরিক অধিকার ফোরাম। সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুর কাছে এ স্মারকলিপি প্রদান করেন। এর আগে প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুর সভাপতিত্বে সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নগরীর দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা, নাগরিক ভোগান্তি এবং সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়।
মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, অতীতে যারা সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে ছিলেন, তারা সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি। কারণ, এ ক্ষেত্রে তারা নগরবাসীর পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাননি। তিনি বলেন, একটি শহরকে সুন্দর রাখতে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, নগরবাসীকেও দায়িত্ব নিতে হবে। ক্লিনিক মালিকদের তাদের ক্লিনিক পরিষ্কার রাখা, বাড়ির মালিকদের নিজেদের আঙিনা পরিষ্কার রাখা এবং মার্কেট মালিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন নাগরিকদের সহায়তায় কাজ করছে, কিন্তু সবকিছু একা করা সম্ভব নয়, তাই সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রশাসক আরও জানান, স্মারকলিপিতে দেওয়া প্রস্তাবনার অধিকাংশই সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যানজট নিরসনে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে দোকান ও মার্কেট মালিকদের সহযোগিতার ওপর তিনি জোর দেন। পাশাপাশি অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সেগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশন একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে পারবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মতবিনিময় সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন নাগরিক অধিকার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক শাহাজাদা এমরান। পরে সংগঠনের সভাপতি ডা. প্রফেসর মো. আবদুল লতিফ স্মারকলিপির মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেন এবং নগরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগের বাস্তব চিত্র কুসিক প্রশাসককে অবহিত করেন।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে আসছে নাগরিক অধিকার ফোরাম। সেই ধারাবাহিকতায় কুমিল্লা নগরীতে বসবাসরত মানুষের বিভিন্ন সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে তারা কিছু কার্যকর ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাবনা প্রশাসনের কাছে তুলে ধরেছে।
স্মারকলিপিতে নগরীর অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংগঠনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে নগরীর পরিবেশ ক্রমেই অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে “পরিচ্ছন্ন কুমিল্লা” নামে একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতৃবৃন্দসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, নির্ধারিত কর্মসূচির মাধ্যমে নগরী পরিষ্কার রাখা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আধুনিক ডাস্টবিন স্থাপন এবং গণশৌচাগার নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় এবং প্রধান বাসস্ট্যান্ডগুলোতে আধুনিক গণশৌচাগার স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পথচারীদের দুর্ভোগের বিষয়টিও স্মারকলিপিতে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, নগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন ফুটপাথ ব্যবহার করে চলাচল করেন। কিন্তু অধিকাংশ স্থানে পর্যাপ্ত ফুটপাথ নেই, কোথাও আবার ফুটপাথ দখল হয়ে আছে দোকানপাট ও স্থাপনায়। অনেক জায়গায় বৈদ্যুতিক খুঁটি, সাইনবোর্ড ও দোকানের মালামাল পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, অন্তত ৬ থেকে ৮ ফুট প্রশস্ত ফুটপাথ নিশ্চিত করা এবং বয়োবৃদ্ধ ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের উপযোগী নকশায় ফুটপাথ নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নগরীতে পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নগরীর যানজট সমস্যার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, একটি পুরনো ও গুরুত্বপূর্ণ নগরী হওয়া সত্ত্বেও কুমিল্লায় এখনো পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে রিকশা, অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নগরীতে যানজট বাড়ছে। অনেক বহুতল ভবনের নির্ধারিত পার্কিং স্থান বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা ছাড়াই নতুন মার্কেট ও ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি নিরসনে পরিকল্পিত গণপরিবহন চালু, যানবাহন নিবন্ধনের আওতায় আনা, নির্দিষ্ট স্থানে স্ট্যান্ড গড়ে তোলা এবং পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সড়কে তোরণ নির্মাণ বন্ধ এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর দাবিও জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে জলাবদ্ধতার সমস্যাও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জলাশয় দখল এবং ড্রেনে বর্জ্য ফেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আধুনিক ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত করা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ড্রেনে ময়লা না ফেলা এবং পলিথিন ব্যবহার কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে স্মারকলিপিতে। সংগঠনটির মতে, মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস, ড্রেনের পানি নিষ্কাশন সচল রাখা এবং বাড়ির আঙিনা, ছাদ ও বারান্দায় জমে থাকা পানি অপসারণে জনগণকে সচেতন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নাগরিক সেবার আধুনিকায়নের বিষয়টিও স্মারকলিপিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল পদ্ধতিতে আনা, অনলাইনভিত্তিক সেবা চালু করা এবং একটি কার্যকর হেল্পলাইন চালু করা গেলে নাগরিকরা দ্রুত ও সহজে সেবা পেতে পারবেন। পাশাপাশি কুমিল্লায় মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঘাটতির কথা তুলে ধরে সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় কিন্ডারগার্টেন থেকে কলেজ পর্যন্ত একটি আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নগরবাসীর জন্য পর্যাপ্ত পার্ক, খেলার মাঠ ও খোলাস্থান বাড়ানোর দাবিও জানানো হয়েছে।
টেকসই নগর উন্নয়নে নাগরিকদের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়ে স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নিয়মিত মতবিনিময় সভা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা প্রয়োজন।
স্মারকলিপি উপস্থাপনের পর নাগরিক অধিকার ফোরামের সভাপতি ডা. আব্দুল লতিফ বক্তব্যে বলেন, নাগরিক অধিকার এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে উত্থাপিত প্রস্তাবনাগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সিটি করপোরেশন। একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার ফোরাম নগর উন্নয়নের যেকোনো উদ্যোগে প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, কুমিল্লা নগরীকে বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শহরে পরিণত করতে প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, নাগরিক অধিকার ফোরামের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ সফিকুর রহমান, জামিল আহমেদ খন্দকার, সংগঠনের সিনিয়র সহ সভাপতি অধ্যক্ষ মো. শরিফুল ইসলাম, সহ সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান, যুগ্ম সম্পাদক রাহুল তারণ পিন্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন, অর্থ সম্পাদক অধ্যক্ষ নার্গিস আক্তার, প্রচার সম্পাদক সৈয়দ আহমেদ লাভলু, নির্বাহী সদস্য কাজী ফখরুল আলম, মীর সোহেল, সদস্য মোসা. শাহানা আক্তার প্রমুখ।
মন্তব্য করুন