প্রকাশিত: ১৩ মে, ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেল দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো পরিকল্পনা পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রস্তাবিত ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি পাস হয়। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার স্বাদু পানি সংরক্ষণ করে ফারাক্কার কুপ্রভাবে বিপর্যস্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীতে প্রাণ ফেরানোই এর মূল অভীষ্ট।
সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকাভুক্ত ছিল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি। এর আগে একাধিকবার একনেক সভায় তোলা হলেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তা অনুমোদন পায়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের প্রথম একনেক সভায়ই এই কৌশলগত প্রকল্পটির ভাগ্য নির্ধারিত হলো। একনেক সভায় উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্প শুধু একটি কংক্রিট স্থাপনা নয়, এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য পরিবেশগত পুনর্জীবনের দলিল। সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে, কমবে লবণাক্ততা, প্রাণ ফিরে পাবে মৃতপ্রায় নদীগুলো— একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।
পদ্মা ব্যারেজের প্রয়োজনীয়তা মূলত ১৯৭৫ সালে ভারতের নির্মিত ফারাক্কা ব্যারেজের সরাসরি পরিণতি। গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে সরিয়ে নেওয়া এবং কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার ওই প্রকল্পটির কারণে বাংলাদেশের অংশে পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, ইছামতি-সহ অসংখ্য নদী নাব্যতা হারিয়ে শুকিয়ে যায়। ওই ক্ষতি প্রশমনেই সরকার প্রথম পর্যায়ে এই ব্যারেজ নির্মাণে হাত দিচ্ছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রকল্পটি সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করতে মোট ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে। মূল উদ্দেশ্য শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি ধরে রেখে দেশের নদীব্যবস্থায় স্বাদু পানির স্থিতিশীল প্রবাহ নিশ্চিত করা।
তবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত সীমান্ত-সংলগ্ন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। সত্তরের দশকে ফারাক্কা ব্যারেজ চালুর পর থেকে বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকাসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খালে লবণাক্ততা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে কৃষি, মৎস্য, নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য পদ্মা ব্যারেজ হয়ে উঠেছে অভিন্ন নদীর পানিতে ন্যায্য অধিকারের প্রতীক ও নিজস্ব সক্ষমতা নির্মাণের এক সাহসী পদক্ষেপ।
মন্তব্য করুন