প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০২:৪৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীকে ইসলামী শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সংশোধিত আইন পুনর্বিবেচনা করে আলেম ও আইনবিদদের মতামত নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরানা পল্টনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এসব দাবি জানান।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সংশোধনী এনে গত ৮ সেপ্টেম্বর সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন-২০২৬’ পাস করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন বিধানের মাধ্যমে কুরআনে নির্ধারিত ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মলনে মুফতি ফয়জুল করীম বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হওয়ায় তাদের ধর্মীয় বিধান পালনে সহায়তা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই নাগরিকদের ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করে এমন কোনো আইন সরকার করতে পারে না।’
সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলামী বিধানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি ইসলামী শরিয়াহতে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে। পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকার আইন অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। পরিবারের বিভিন্ন স্তরের উত্তরাধিকারীদের অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এর বাইরে নতুন কোনো পদ্ধতি সংযোজনের প্রয়োজন বা সুযোগ নেই।’
সংবাদ সম্মেলনে হেবা ব্যবস্থার অপব্যবহারের কারণে বাবা-মায়ের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এ প্রসঙ্গে মুফতি ফয়জুল করীম বলেন, ‘শরিয়াহর উত্তরাধিকার আইনকে পাশ কাটিয়ে সন্তানদের নামে সম্পত্তি ‘হেবা’ করার প্রবণতা সমাজে রয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা জীবদ্দশায়ই নিজেদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত বা উচ্ছেদ হচ্ছেন। বৃদ্ধ বয়সে তাদের গৃহহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।’
তবে এর সমাধান হিসেবে শরিয়াহর বিধানে পরিবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘এই সমস্যার মূল কারণ শরিয়াহর উত্তরাধিকার বিধান এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। তাই এর সমাধান করতে গিয়ে আবার শরিয়াহর বিধান পরিবর্তন করা যাবে না। সমস্যা সমাধানের জন্য সামাজিক ও আইনগতভাবে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’
ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাবা-মাকে জীবদ্দশায় সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদের প্রবণতা বন্ধে শুধু আইনি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে পরিবার ও সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। সন্তানদের শৈশব থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলার পাশাপাশি একান্নবর্তী পরিবারের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনার দাবি জানান মুফতি ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, অনেক বাবা-মা নিজেদের সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে চান না। তাই প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত।
সংশোধিত হেবা আইনের বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যার সমালোচনা করে তিনি বলেন, দানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সহজ বা পরিবর্তনের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যা ইসলামী শরিয়াহর নির্ধারিত উত্তরাধিকার কাঠামোকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে।
ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, শরিয়াহ-সম্পর্কিত বিষয়ে দেশের আলেম-উলামাদের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। দলটির মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞার শামিল।
আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মুফতি ফয়জুল করীম বলেন, শরিয়াহ-সম্পর্কিত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আলেমদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তার ভাষ্য, আইনমন্ত্রী পশ্চিমা ও ব্রিটিশ আইনে দক্ষ হলেও শরিয়াহ আইন ও এর প্রয়োগ সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের বিশেষ জ্ঞান রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করা হয়। বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সামাজিক অস্থিরতা ও বিদ্যুৎ সংকটের মতো সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়ে ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, এসব সংকটের মধ্যেই শরিয়াহবিরোধী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ তাদের হতাশ করেছে।
তবে আইনটি গভীরভাবে পর্যালোচনা না করেই আনা হয়ে থাকতে পারে উল্লেখ করে সরকারের প্রতি ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। উলামায়ে কেরাম ও আইনবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে সংশোধিত আইনটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান মুফতি ফয়জুল করীম।
হেবা আইন বাতিল ও সংশোধনী পুনর্বিবেচনার দাবিতে কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দেশের সব বিভাগীয় শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করবে দলটি।
মন্তব্য করুন