মোঃ নাজমুল হুদা

প্রকাশিত: ৪৩ মিনিট আগে, ১২:৫২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্যদের পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচিত হবেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই ভোটে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে নেমেছে রিপাবলিকানরা। অন্যদিকে, দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে চায় ডেমোক্র্যাটরা।

নির্বাচন সামনে রেখে কয়েক সপ্তাহ ধরেই আগাম ভোটগ্রহণ চলছে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো ভোটার উপস্থিতি হলে এবার ১০ কোটিরও বেশি মানুষ ভোট দিতে পারেন। প্রচারেও ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। বিজ্ঞাপনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে ব্যয় হয়েছে রেকর্ড ৩৮০ কোটি ডলার।

টেক্সাস, ওহাইও ও মিশিগানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচন ঘিরে বিজ্ঞাপনে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। নির্বাচনী অর্থায়নের নথি অনুযায়ী, ধনকুবের ইলন মাস্ক রিপাবলিকানদের সমর্থনে একাই প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয় করেছেন।

তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি কম থাকে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ১৫ কোটি ৫০ লাখের বেশি ভোট পড়েছিল।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি, আর ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। এ ছাড়া দুটি আসন শূন্য রয়েছে। একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে কাজ করেন। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে।

সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে রিপাবলিকানদের। সেখানে তাদের আসন ৫৩টি, আর ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে।

মেইন, ওহাইও, নর্থ ক্যারোলাইনা, আইওয়া ও জর্জিয়াসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই সিনেটের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন কি ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রভাব ফেলবে?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না। তবে এই নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়।

নির্বাচনে খারাপ ফল হলে প্রেসিডেন্টকে তাঁর নীতি ও কর্মপদ্ধতি পরিবর্তনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দলের জন্যও এবারের নির্বাচন বড় পরীক্ষা।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে আইন পাস, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি এবারের ফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারকৌশল নির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে।

জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা

রয়টার্স ও ইপসোসের সেপ্টেম্বরের এক জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন কমে ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা তাঁর জন্য সর্বনিম্ন পর্যায়।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এসব বিষয়ে অসন্তোষের কারণে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থন কমার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, ভোট দেওয়ার ব্যাপারে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের আগ্রহ রিপাবলিকানদের তুলনায় বেশি বলে কিছু জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আগাম ভোটের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ডেমোক্র্যাটরা সুবিধা পেতে পারেন।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন করা হিস্পানিক বা লাতিনো ভোটারদের একাংশ আবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ডেমোক্র্যাটদের বড় ব্যবধানে জয়ের নিশ্চয়তা নেই। দলটির প্রতি কিছু ভোটারের অনাস্থা, নির্বাচনী প্রচারে রিপাবলিকানদের বেশি অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা এবং ডেমোক্র্যাটদের বামপন্থি কয়েকজন প্রার্থীর প্রাথমিক নির্বাচনে জয় মধ্যপন্থি ভোটারদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

অতীতের নির্বাচন কী বলছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বড় ধাক্কা খাওয়ার নজির রয়েছে।

২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৬৩টি আসন বাড়িয়ে বড় জয় পায়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোচ্ছিল না। ওবামার স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার নিয়েও সমর্থন দুর্বল ছিল। ফলে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারায়। সিনেটে ছয়টি আসন হারালেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল দলটি।

সেই ফলকে ওবামা ‘বড় ধাক্কা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এরপর রিপাবলিকানরা প্রতিরক্ষা খাতের বাইরে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর দাবি তোলে।

২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ডেমোক্র্যাটরা পাল্টা সাফল্য পায়। তারা প্রতিনিধি পরিষদে নিট ৪০টি আসন বাড়ায়। তবে সিনেটে তাদের আসন নিট দুটি কমে যায়।

এবার ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৬টিতে গভর্নর নির্বাচন হবে। পাশাপাশি প্রায় সব অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় বিভিন্ন আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালটপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় রিপাবলিকানদের দখলে প্রায় ৫৫ শতাংশ আসন, আর ডেমোক্র্যাটদের দখলে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে স্পিকার হতে পারেন হাকিম জেফরিস

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে দলের নেতা ও নিউইয়র্কের প্রতিনিধি হাকিম জেফরিস স্পিকার হতে পারেন। বর্তমানে তিনি প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উত্তরাধিকারক্রমে ভাইস প্রেসিডেন্টের পর তৃতীয় অবস্থানে থাকেন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার। জেফরিস এই পদে নির্বাচিত হলে তিনি হবেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান স্পিকার।

স্পিকার হিসেবে তিনি প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটিকে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করার উদ্যোগ নিতে সহায়তা করতে পারবেন। ট্রাম্প প্রশাসনে ‘নজিরবিহীন মাত্রার দুর্নীতি’ হয়েছে বলে অভিযোগ করে এ বিষয়ে তদন্তের কথা জানিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।

জেফরিসের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটরা স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, আবাসন ও জ্বালানিসহ জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।

অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা জয়ী হলে স্পিকারের পদ তাদের হাতেই থাকবে। বর্তমান স্পিকার মাইক জনসন দায়িত্বে থাকতে পারেন, অথবা দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী অন্য কোনো রিপাবলিকান এ পদে আসতে পারেন।

রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে আরও কর ছাড়, প্রতিরক্ষা খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতে ব্যয় কমানো। ট্রাম্পের ২০২৫ সালের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’ আইনের মাধ্যমে নেওয়া নীতিগুলোর ধারাবাহিকতায় এসব উদ্যোগ আসতে পারে।

যেসব নির্বাচনের দিকে নজর সবার

প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকটি আসনে এবারের লড়াই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। নিউইয়র্কের একটি আসনে রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক ললার পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়ছেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওই আসনের এলাকার ভোটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস জয়ী হয়েছিলেন।

নেব্রাস্কার একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনও আলোচনায় রয়েছে। সেখানে কোনো বর্তমান প্রতিনিধি পুনর্নির্বাচনে লড়ছেন না। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে কৃষক ও ট্রাকচালকেরা চাপের মুখে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি ভোটের ফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া পেনসিলভানিয়ার দুটি এবং নিউ জার্সির একটি আসন রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায় ডেমোক্র্যাটরা।

নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা ঘিরেও উদ্বেগ

এবারের নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা করবেন কি না।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব ৫০টি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব কর্তৃপক্ষের হাতে। ২০২০ সালের নির্বাচন থেকে ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, দেশটির নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়। তবে তাঁর এসব দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের কোনো উদ্যোগ নিলে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনী কর্মকর্তা ও কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা।

সূত্র: রয়টার্স

 

মন্তব্য করুন