প্রকাশিত: ৪৮ মিনিট আগে, ০৪:৩৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার মোট ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। গত ২২ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছেন।
ফেল করা পরীক্ষার্থীদের আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
জিপিএ-৫ কমেছে ৪২ শতাংশ
এবার পাসের হার কমার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন বা প্রায় ৪২ শতাংশ।
গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
ফল বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়েছে। বড় সিলেবাসের কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপেও পড়েছেন।
এ ছাড়া গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সব বোর্ডে অভিন্ন ও মানসম্মত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া, খাতা মূল্যায়নে বাড়তি নম্বর না দেওয়া এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে কঠোর নজরদারি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়গুলোও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশও ফল বিপর্যয়ের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী কলেজবিমুখ হয়ে পড়েন। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ও পড়াশোনায় মনোযোগের ক্ষেত্রেও অনীহা তৈরি হয়েছিল বলে তাঁদের ধারণা।
ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১.৮০ শতাংশ
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে এ বোর্ডে পাসের হার কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ।
১৫ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম বোর্ডে সর্বনিম্ন পাস
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত ১৫ বছরের মধ্যে এ বোর্ডে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ২০১ জন।
রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৪৫.০৬ শতাংশ
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে স্বয়ংক্রিয় পাসের পর এবারই এ বোর্ডে পাসের হার সর্বনিম্ন।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, বোর্ডের ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৬১ হাজার ৮৯৪ জন।
বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন বলেন, “শিক্ষার্থীরা খাতায় যেমন লিখেছে, সেভাবেই নম্বর পেয়েছে। কাউকে বাড়তি নম্বর দেওয়া হয়নি। তাই সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব পড়েছে।”
বরিশালে ১১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেননি
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৫০ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা—দুটিই কমেছে। এ বোর্ডের ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি।
ফল ঘোষণা করেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা। তিনি বলেন, “এবারের ফল যথাযথভাবে পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটেছে।”
মানবিক বিভাগে অকৃতকার্য সবচেয়ে বেশি
১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ হলেও ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মানবিক বিভাগে পাসের হার সবচেয়ে কম।
এ বিভাগে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩২ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ৯০ হাজার ৬৬৪ জন। অন্যদিকে, ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন। সব মিলিয়ে মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
সামগ্রিক ফলাফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বোর্ডে পাসের হারেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ফল বিপর্যয়ের কারণ ও শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ নিয়ে এখন সংশ্লিষ্টদের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে।
মন্তব্য করুন