মোঃ নাজমুল হুদা

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৯:৩৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

মানহানির মামলা করলেন রোনেন বার, নির্বাচনের আগে চাপে নেতানিয়াহু

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার দায় চাপানো এবং মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের সাবেক প্রধান রোনেন বার। বুধবার দায়ের করা মামলাটি এমন সময় এল, যখন আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর ফলে ইসরাইলের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।

১৩৪ পৃষ্ঠার নথিসহ আদালতে দায়ের করা মামলায় রোনেন বার অভিযোগ করে বলেন, নেতানিয়াহু ‘নিজের দায় লুকাতে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন’। তাঁর দাবি, হামলার বিষয়ে ‘অপরাধমূলক ব্যর্থতার’ দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টতই তাঁর মানহানি করেছেন। মামলায় বলা হয়, নেতানিয়াহু ‘সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন কিছু মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন, যেন ৭ অক্টোবরের ঘটনার নিজের দায় থেকে জনদৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।’

রোনেন বার জানান, সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত পাওয়ামাত্র তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিবকে ফোন করেছিলেন। কারণ নেতানিয়াহুকে সরাসরি ফোন করার মতো কোনো নম্বর তাঁর কাছে ছিল না। মামলার নথিতে আরও বলা হয়েছে, বিগত কয়েক বছর ধরে নেতানিয়াহু যে নীতি নিয়েছিলেন, তার কারণেই ‘গাজায় সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হুমকি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।’

তবে নেতানিয়াহুর দাবি, ওই ভোরে হামলার বিষয়ে রোনেন বার তাঁকে আগে কিছুই জানাননি। শিন বেতের তৎকালীন প্রধান কিংবা সামরিক প্রধানেরা ফোন করে ভোরে তাঁকে ঘুম থেকে তুলে বিষয়টি জানালে তিনি হামলা ঠেকাতে পারতেন বলেও তিনি দাবি করেন।

বারের অভিযোগের জবাবে বুধবারই নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি একটি বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, ‘রোনেন, আপনি কি রসিকতা করছেন?’ বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘রেড লাইনে তো আমার নম্বর আপনার কাছেই ছিল। অন্য সব নিরাপত্তা প্রধানের মতো আপনিও তো সঙ্গে সঙ্গে আমাকে কল করতে পারতেন। শুধু সময়ে একটা ফোন করলে আর কতগুলো প্রাণ আমরা বাঁচাতে পারতাম, ভাবুন তো!’

ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এ ঘটনার পর পরস্পরকে দোষারোপের মধ্যেই ২০২৫ সালের জুনে শিন বেতের প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন রোনেন বার। শুরু থেকেই তিনি দাবি করে আসছেন, হামলার হুমকির কথা তিনি আগেই নেতানিয়াহুকে জানিয়েছিলেন।

বারের মামলার কয়েক দিন আগেই নতুন এক অভিযোগ সামনে আসে। নেতানিয়াহুর সাবেক সামরিক সচিব অবি গিল ইসরাইলের চ্যানেল ১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ৭ অক্টোবরের ঘটনার রেকর্ড বা নথিপত্র জালিয়াতি করা হয়েছে। এমনকি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের সময়ও বদলে ফেলা হয়েছে।

২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত সামরিক সচিবের দায়িত্বে থাকা অবি গিল জানান, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক স্টেনোগ্রাফার তাঁর কাছে আসেন। ওই স্টেনোগ্রাফার জানান, নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফের নির্দেশ রয়েছে, স্থানীয় সময় ভোর ৬টা ৪০ মিনিটের চার মিনিটের একটি ফোনালাপের নথি বদলে ভোর ৬টা ২৯ মিনিট করে দিতে হবে।

অবি গিল বলেন, ‘ওই নারী স্টেনোগ্রাফার আমাকে এসে বলেছিলেন, ‘আমি এটা পরিবর্তন করতে পারব না’।’ নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের প্রধানের বিরুদ্ধে টেলিফোন রেকর্ড কারচুপির অভিযোগ এনে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এগুলো শতভাগ সত্যি ঘটনা, এতে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।’

এর আগে গত মাসে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিসরের গোয়েন্দা প্রধান আব্বাস কামেলও হামলার বিষয়ে আগেভাগেই নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন। তার আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি নিজে ইসরাইলে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন এবং হামাসের সম্ভাব্য হামলার কথা জানান।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় সাবেক কর্মকর্তা, সরকারি আমলা ও বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন নেতানিয়াহু। জরিপে দেখা যাচ্ছে, রক্তপাত ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখতে তাঁকে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে।

ইসরাইলের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সীমান্ত বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢোকার ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ২২১ জন ইসরাইলি নিহত হন। একই সঙ্গে ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়, যাঁদের মধ্যে সেদিন নিহত ৪৪ ইসরাইলির লাশও ছিল।

এর পর গত তিন বছরে গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর লাগাতার হামলায় ৭৪ হাজার ৩০০-র বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে অবরুদ্ধ ভূখণ্ডটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এ ছাড়া গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি হামলায় গাজায় ১ হাজার ৪০০-র বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

সূত্র: আলজাজিরা

মন্তব্য করুন