মোঃ নাজমুল হুদা

প্রকাশিত: ১৩ ঘন্টা আগে, ০৩:৪৬ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ফিলিস্তিনপন্থী এলাকায় বিদেশি ক্রেতাদের সম্পত্তি কেনা নিয়ে উত্তেজনা

গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের এক কম্পিউটারের সামনে বসে সম্পত্তির চুক্তিপত্র দেখছিলেন ৬৯ বছর বয়সী স্থপতি তোনিয়া কাতেরিনি। তাঁর দাবি, এসব চুক্তির মধ্য দিয়েই বদলে যাচ্ছে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিত পাড়া।

এথেন্সের এক্সারখিয়া এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী রাজনীতির জন্য পরিচিত। এখন সেখানে একের পর এক ফ্ল্যাট কিনে স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার আবাসনে রূপান্তর করা হচ্ছে। এতে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গত কয়েক মাস ধরে কাতেরিনি ও তাঁর কয়েকজন প্রতিবেশী সরকারি নথি ঘেঁটে বিদেশিদের সম্পত্তি কেনার তথ্য সংগ্রহ করছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা একটি ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করেছেন, যেখানে বিদেশিদের কেনা সম্পত্তি লাল বিন্দু দিয়ে চিহ্নিত। নিজের সড়ক থেকে মানচিত্রটি বড় করে দেখালেন কাতেরিনি: পুরো এলাকাজুড়ে অসংখ্য লাল বিন্দু।

কাতেরিনি ও তাঁর সহযোগীদের দাবি, এসব স্বল্পমেয়াদি ভাড়াবাড়িতে বিনিয়োগ করা অর্থের বড় অংশ এসেছে ইসরাইলি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। তাঁদের হিসাবে, এলাকায় নতুন চালু হওয়া কোম্পানি-পরিচালিত হোটেল ও ভাড়াবাড়ির অর্ধেকেরও বেশি ইসরাইলিদের মালিকানাধীন। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে যেখানে বারান্দায় পতাকা ঝুলছে, দেয়ালে দেয়ালে প্রতিবাদী স্লোগান লেখা, সেখানে এই বিষয়টি নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

কাতেরিনির ভাষ্য, তাঁর সড়কে ইসরাইলি বিনিয়োগকারীরা দুটি ভবন কিনেছেন। তাঁর ফ্ল্যাটের ঠিক নিচের ফ্ল্যাটটিও একটি কোম্পানির মালিকানাধীন। তিনি বলেন, ‘নিচতলায় যারা আছেন, তারা ভালো মানুষ। তবে কোম্পানিটি ইসরাইলি।’

কয়েকটি সড়ক দূরে একটি আবাসিক ভবনের দেয়ালজুড়ে কালো রঙের দাগ। সেখানে লেখা, ‘এয়ারবিএনবি আমাদের গৃহহীন করছে।’ আরেকটি স্লোগানে লেখা, ‘জায়নবাদীরা স্বাগত নয়।’ এলাকার বিভিন্ন ভবনের প্রবেশপথ ও কিপ্যাডে লাল রং ছিটিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার ব্যবসা এলাকায় আগ্রাসীভাবে অভিজাতকরণ ঘটাচ্ছে। এতে বাড়িভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, উচ্ছেদ হচ্ছেন স্থানীয়রা এবং হারিয়ে যাচ্ছে এলাকার নিজস্ব পরিচয়।

গ্রিসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির আবাসন খাতে অনাবাসী বিদেশিদের বিনিয়োগ রেকর্ড ২৭৫ কোটি ইউরোতে পৌঁছায়। পরের বছর বিনিয়োগের গতি কিছুটা কমে। এথেন্সে কোন দেশের নাগরিকেরা কত সম্পত্তি কিনছেন, সে বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান নেই। গ্রিক সাপ্তাহিক পত্রিকা তো ভিমার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিম্যাক্স হেলাসের বার্ষিক জরিপে রাজধানীসংলগ্ন আতিকা অঞ্চলে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে ইসরাইলিরা শীর্ষে। তাঁদের পরে আছেন তুরস্ক ও লেবাননের ক্রেতারা।

এক্সারখিয়ায় ২৪ বছর ধরে বসবাস করছেন ৪৬ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষক ক্রিসুল্লা পাপাগেওরগিউ। তিনি বলেন, করোনা মহামারির পর বিভিন্ন কোম্পানি পুরো ভবন কিনতে শুরু করে। ‘রাতারাতি ভাড়াটিয়ারা উচ্ছেদ হয়েছে, খালি হয়ে গেছে একের পর এক আবাসিক ভবন।’ প্রথমেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অভিবাসী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। বন্ধ হয়ে গেছে পুরোনো বইয়ের দোকান, ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে ও মুদির দোকান। বছরের পর বছর বাসিন্দারা দখল করা ভবনে শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছেন। পাপাগেওরগিউ বলেন, ‘এক সময় অর্ধেক ভবনই ছিল দখল করা আশ্রয়কেন্দ্র। এখন মাত্র একটি রয়েছে।’

২০২২ সাল থেকে এক্সারখিয়া চত্বর, যা দীর্ঘদিন এলাকার বিক্ষোভ-প্রতিবাদের কেন্দ্রস্থল, নতুন মেট্রো স্টেশন নির্মাণের জন্য ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। পাপাগেওরগিউ বলেন, দাঙ্গা পুলিশ এখন প্রতিদিনের দৃশ্য। তাঁর ধারণা, এর উদ্দেশ্য এথেন্সের কেন্দ্রীয় এলাকাকে ‘পুরোপুরি পর্যটননির্ভর’ করে তোলা। সাম্প্রতিক বছরে সম্পত্তি কিনতে আসা ক্রেতারা ‘প্রায় সবাই ইসরাইলি’ বলেও দাবি করেন তিনি।

কাতেরিনির মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইসরাইলের চেয়ে গ্রিসকে নিজেদের অর্থ রাখার নিরাপদ জায়গা হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষ্য, এথেন্সে ‘সরকারও ইসরাইলের প্রতি খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ’। গত আগস্টে গ্রিস ইসরাইলের সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি করেছে।

এথেন্স-আতিকা রিয়েল এস্টেট এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের একটি শাখার প্রধান ভ্যাগেলিস লাজারিদিস বলেন, এলাকাটি আগে অবহেলিত ছিল। তাই এটি বিনিয়োগের জন্য ‘দারুণ সুযোগ’ তৈরি করেছে। এথেন্সের কেন্দ্রের কাছে হওয়ায় এবং মেট্রো স্টেশন ও বিদেশি শিক্ষার্থীতে ভরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি থাকায় এলাকাটির অবস্থান সুবিধাজনক।

আবাসনবাজারের উত্তাপ কমাতে এখন উদ্যোগ নিয়েছে গ্রিস সরকার। প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস গত মাসে ঘোষণা দিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোর নাগরিকদের বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সম্পত্তি হস্তান্তর কর আগামী বছরের জুলাই থেকে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হবে। এ নিয়ে জেরুজালেম পোস্ট লিখেছে, ‘গ্রিসে উৎসবের দিন শেষ।’ লাজারিদিস জানান, রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের সংগঠনগুলো এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। প্রস্তাবটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি। তাঁর ধারণা, এটি কার্যকর না-ও হতে পারে কিংবা বাস্তবায়ন পিছিয়ে যেতে পারে।

ইউক্রেনের বাসিন্দা ইরিনা রন্দিয়াক এক্সারখিয়ার কাছে নিজের রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান চালান। তাঁর ভাষ্য, প্রায় এক দশক আগে ইসরাইলি ক্রেতারা আসতে শুরু করেন এবং তাঁর বিদেশি গ্রাহকদের প্রায় ৬০ শতাংশ ছিলেন ইসরাইলি। তাঁর হিসাবে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর মোট সম্পত্তি বিক্রির প্রায় ৭০ শতাংশের সঙ্গে বিদেশি ক্রেতারা যুক্ত ছিলেন। চলতি বছর সেই হার নেমেছে প্রায় ৩০ শতাংশে। এর কৃতিত্ব তিনি দেন তরুণ গ্রিক নাগরিকদের সরকারি সহায়তায় বাড়ি কেনার ‘স্পিতি মু’ ঋণ কর্মসূচিকে।

তো ভিমার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক্সারখিয়াসহ এথেন্সের কেন্দ্রীয় এলাকায় নতুন স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না। গত সেপ্টেম্বরে এই নিষেধাজ্ঞা ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ‘গোল্ডেন ভিসা’ কর্মসূচির আওতায় কেনা সম্পত্তি এখন শুধু দীর্ঘমেয়াদে ভাড়া দেওয়া যাবে। রন্দিয়াক বলেন, ‘গ্রিসে বসবাস করেও মানুষ কেন্দ্রীয় এলাকায় থাকার মতো বাড়ি খুঁজে পেত না। সবকিছুই এয়ারবিএনবি হয়ে গিয়েছিল। এখন এ ধরনের ভাড়াবাড়ি অনেক কম।’ তাঁর মতে, পরিস্থিতি ‘কিছুটা ভালো’ হয়েছে, তবে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দারা অবশ্য এখনো আশাবাদী হতে পারছেন না। তাঁদের মতে, নিষেধাজ্ঞা সাময়িক এবং পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে বিনিয়োগকারীরা নানা উপায়ে বাজারে ঢুকতে পারেন। এত দিনে এলাকার অনেক ভবনই স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার আবাসনে পরিণত হয়েছে, আর নতুন নিষেধাজ্ঞা অতীতের পরিবর্তন ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

পাপাগেওরগিউ নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করেন। তাঁর বাড়িওয়ালার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে ওই এলাকায় থাকে। বাড়িওয়ালা ভাড়া না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাকে পাপাগেওরগিউ বলেন ‘প্রতিরোধ’।

সূত্র: আলজাজিরা

মন্তব্য করুন