রান্নু ,গোবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩ ঘন্টা আগে, ০২:২১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

গোবিপ্রবির সাবেক শিক্ষার্থীর ‘বলুন’: গোপনীয়তা রেখে হয়রানির প্রতিবাদ

কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন কিংবা হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় হয়রানির অভিজ্ঞতা পরিচয় গোপন রেখে জানানোর সুযোগ তৈরি করেছে ‘বলুন’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) এর কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম মুরাদের উদ্যোগে গত ১ অক্টোবর প্ল্যাটফর্মটির যাত্রা শুরু হয়। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৫৩ জেলার ৮০০ এর বেশি প্রতিষ্ঠান এবং ৫ হাজার ৪০০ এর বেশি বিভাগ প্ল্যাটফর্মটিতে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

‘বলুন’ মূলত এমন একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কোনো ব্যক্তি নিজের নাম, ফোন নম্বর, ইমেইল বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করেই কোনো প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার কথা জানাতে পারেন। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় ব্যবহারযোগ্য এই সেবাটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

প্ল্যাটফর্মটির আওতায় কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাস,ট্রেন,লঞ্চ, রাইড শেয়ারিং, হাসপাতাল, শপিং মল, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর এবং অনলাইন পরিসরের অভিজ্ঞতাও জানানোর সুযোগ রয়েছে। উদ্যোগটির লক্ষ্য হলো, ভয় কিংবা পরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় যেসব অভিজ্ঞতা সাধারণত সামনে আসে না, সেগুলোকে আলোচনায় আনা।

উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম মুরাদ জানান, তাঁর স্ত্রীর প্রথম চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই এই উদ্যোগের চিন্তা আসে। তাঁর মতে, চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানা গেলেও একটি প্রতিষ্ঠানে মানুষ কতটা নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ পাবেন, তা আগে থেকে বোঝার নির্ভরযোগ্য উপায় সীমিত।

প্ল্যাটফর্মটির দর্শন তুলে ধরে মুরাদ বলেন, “বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে বেতন ও ইনক্রিমেন্ট জানা যায়। কিন্তু সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর আড়ালে থাকে, এই প্রতিষ্ঠানে একজন মানুষ হিসেবে আমি কতটা নিরাপদ, সম্মানিত এবং মানবিক পরিবেশ পাব? এই প্রশ্ন থেকেই 'বলুন' এর যাত্রা শুরু।”

প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একজনের অভিজ্ঞতা অন্য কাউকে সতর্ক করতে পারে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। একই প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে একাধিক মানুষের অভিজ্ঞতা এক জায়গায় এলে সেখানকার পরিবেশ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। এভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

তবে প্ল্যাটফর্মটিতে জমা পড়া প্রতিবেদন সরাসরি প্রকাশ করা হয় না। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে স্প্যাম ও বটের কার্যক্রম শনাক্ত করা হয়। এরপর মানব মডারেটর প্রতিটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন। কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে সরাসরি অভিযোগ করা হলে তা গ্রহণ করা হয় না। এক বা দুটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে একাধিক অভিজ্ঞতার ধরন বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্কোর তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ‘বলুন’ কারও বিরুদ্ধে রায় দেওয়া কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানকে দোষী সাব্যস্ত করার প্ল্যাটফর্ম নয়। বরং মানুষের অভিজ্ঞতা সামনে আনা, সচেতনতা তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে বেনামী প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার ও মিথ্যা প্রতিবেদন ঠেকানোও তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

পাঁচজনের একটি স্বেচ্ছাসেবী দল নিজেদের পেশাগত কাজের পাশাপাশি উদ্যোগটি পরিচালনা করছে। ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও সেখানে প্রতিবেদন না থাকাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

‘বলুন’ কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয় এবং এটি পুলিশ, আদালত বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর বিকল্পও নয়। প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত তথ্যকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিজ্ঞতা বা অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, পরিচয় প্রকাশের ভয় ছাড়াই অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি হলে মানুষ আগে থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন। পাশাপাশি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের পরিবেশ আরও নিরাপদ ও সম্মানজনক করে তোলার বিষয়ে উৎসাহিত হবে।

মন্তব্য করুন