প্রকাশিত: ৮ ঘন্টা আগে, ১১:২৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
উত্তরের সীমান্ত জেলা লালমনিরহাটে চা চাষাবাদে বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ক্ষতিকারক তামাকের বিকল্প ফসল হিসেবে চা বদলে দিতে পারে জেলার অর্থনীতির চাকা। চায়ের চাষাবাদ লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। পর্যাপ্ত সার সরবরাহ এবং চা বোর্ডের সহযোগিতা পেলে চা চাষিরা ঘুরে দাঁড়াবেন।
আদিতমারীর ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের তালুক দুলালি মৌজায় ২০১৬ সালে পরীক্ষামূলক চা চাষাবাদ শুরু করেন উদ্যোক্তা জামাল উদ্দিন সরকার। পেশায় আইনজীবী হলেও তার হাত ধরেই এখানে চা চাষ শুরু হয়। তাকে অনুসরণ করে অনেক কৃষক চায়ের চাষাবাদ শুরু করেন। এছাড়া সরকার ২০০৭ সালে ‘Eradication of Rural Poverty by Extension of Small Holding Tea Cultivation in Lalmonirhat’ প্রকল্পের আওতায় ১০০ হেক্টর জমিতে চা চাষাবদের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করে। বছরে ২ দশমিক ৫ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এতে। পরে পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা ও কালিগঞ্জে চা চাষাবাদ বিস্তৃতি লাভ করে। চা চাষের উন্নয়নে নর্দার্ন টি বেল্টের আওতায় জেলায় চা বোর্ড তাদের অফিস চালু করে। করোনার সময় শ্রমিক সংকট ও চায়ের বাজারমূল্য না পাওয়ায় জেলার চা চাষাবাদ লোকসানের মুখে কিছুটা স্থবির হয়ে পড়ে। জেলায় উৎপাদিত চা বিক্রির জন্য নিজস্ব পারচেজ হাউস গড়ে না ওঠায় পঞ্চগড়ে নিয়ে চা বিক্রি করতে হতো। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ায় চা পাতার রঙ কিছুটা বিবর্ণ হয়ে যেত। এ সুযোগে ক্রয়কেন্দ্রগুলো চাষিদের কাছ থেকে ২০-৩০ শতাংশ ডিসকাউন্ট কেটে নিত। এতে চাষিরা অব্যাহত লোকসানের মুখে পড়েন। ফলে অনেক চাষি চাষাবাদ গুটিয়ে নেন।
সংকট কাটিয়ে উৎপাদিত চায়ের বর্তমান মূল্য প্রতি কেজি ৩৮ টাকা হওয়ায় জেলার চা চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। লালমনিরহাটের কৃষক যখন আলু, ধান, ভুট্টা ও তামাক চাষ করে অব্যাহত লোকসান গুনে কৃষিবিমুখ হচ্ছিলেন, তখন অর্থকরি ফসল চায়ের চাষাবাদ করে স্বনির্ভরতার স্বপ্ন বুনছেন তারা।
চায়ের চারা রোপণ করার পর বছরে সাতবার চাপাতা তোলা যায়। প্রতিবিঘা জমিতে বছরের শুরুতে প্রথম দফায় ৮০০ কেজি, দ্বিতীয় দফায় এক হাজার ২০০ কেজি, তৃতীয় দফায় এক হাজার ৭০০ কেজি—এভাবে প্রতি দফায় বৃদ্ধি পেয়ে বিঘাপ্রতি তিন হাজার কেজি পর্যন্ত উৎপাদন হয়ে থাকে।
প্রতি দফায় চাপাতা সংগ্রহ করার পর বিঘাপ্রতি ২৫ কেজি ইউরিয়া, ২৫ কেজি টিএসপি, ২৫ কেজি ডিএপি, ১৫ কেজি পটাশ সার দিতে হয়, যার বাজারমূল্য দুই হাজার ৮০০ টাকা। বালাইনাশক ও উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধির জন্য স্প্রে করতে হয় চারবার, যার বাজারমূল্য এক হাজার টাকা, চাপাতা সংগ্রহ করে গাড়িতে লোড করা ব্যয় কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা, ফ্যাক্টরি পর্যন্ত চাপাতা পরিবহন খরচ এক টাকা, আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ১১-১৩ টাকা কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ হয়, সেটি বিক্রি হয় ৩৮ টাকা দরে। প্রতি দফা চা উত্তোলনের পর গতানুতিক হারে এর উৎপাদন বিঘাপ্রতি ৫০০ কেজি বৃদ্ধি পায়। ফলে বছর শেষে বিঘাপ্রতি কোনো ঝুঁকি ছাড়াই তিন লাখ টাকা মুনাফা করেন চা-চাষিরা।
ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের তালুক দুলালির চা-চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ১২ বিঘা জমিতে চায়ের চাষাবাদ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার দেখাদেখি অনেকেই চা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত সার না পাওয়া এবং চারা সংকট। তিনি চা বোর্ডের সহযোগিতা না করার কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, প্রতিবার পাতা সংগ্রহের পর উৎপাদন ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত সারের প্রয়োজন হয়। সার সংকটের কারণে রেশনিং পদ্ধতিতে ভুট্টা, ধান, আলুচাষিরা সার পেলেও চা-চাষিরা প্রয়োজনীয় সার পান না। চা বোর্ড এ ব্যাপারে কোনো সহযোগিতা করছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চা-চাষিদের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। ফলে চাহিদার সময় দ্বিগুণ দামে কালোবাজার থেকে সার কিনতে হয় চাষিদের।
উদ্যোক্তা জামাল উদ্দিন ৩৬ বিঘা জমিতে চায়ের আবাদ করেন। তিনি জানান, চা চাষাবাদ বিস্তৃত করতে লালমনিরহাটে চা বোর্ডের অফিস করেছে সরকার। শুরুতে চা বোর্ড আমাদের চায়ের চারা, স্প্রে মেশিন, পানি সরবরাহের শ্যালো মেশিন, পাতা পুলিং মেশিন, কাটিং মেশিন সরবরাহ করলেও গত তিন বছর যাবৎ চা বোর্ডের প্রকল্প বন্ধ থাকায় কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। সরকার চা শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করলেও আদিতমারী উপজেলা সমাজসেবা অফিস আমাদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা এ পর্যন্ত দেয়নি।
তিনি আরো বলেন, চা চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এ জেলায়। সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে চায়ের চাষাবাদ ছড়িয়ে দিলে জেলার মানুষ আর্থিকভাবে লাভবান হবে। চায়ের বর্তমান বাজারমূল্যে চা চাষাবাদ অত্যন্ত লাভজনক এবং ঝুঁকিমুক্ত। ফলে করোনার সময়ে যারা চা চাষাবাদ গুটিয়ে নিয়েছিলেন, তারা নতুন করে চা চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
লালমনিরহাট চা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমির হোসেন জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে চা চাষিদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। তিন বছর ধরে নতুন প্রকল্প না নেওয়ায় চা চাষাবাদে চাষিদের কোনো সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছি না। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা উচ্চতর শিক্ষার জন্য ছুটিতে থাকায় মাঠ পর্যায়ে চাষিদের পরামর্শ দেওয়া যাচ্ছে না। আমি পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ পাঁচ জেলার দায়িত্বে থাকায় একাই সব সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। লোকবল সংকট দূর করে নতুন প্রকল্প নেওয়া গেলে জেলায় চা চাষাবাদ সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা দূর করা যেত।
তিনি আরো জানান, জেলায় গত বছর চার লাখ ২৮ হাজার ৬৪১ কেজি সবুজ চাপাতা উৎপাদন হয়েছে।
মন্তব্য করুন