প্রকাশিত: ১৭ মিনিট আগে, ১২:১৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
কোটা সংস্কার আন্দোলনের তুলে নেওয়া সমন্বয়কদের মুক্তিসহ নতুন তিন দফা দাবিতে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতেই ২৮ জুলাই রাত ৯টায় আটক রাখা ছয় কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের একটি ভিডিওবার্তা ছড়িয়ে দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আন্দোলন প্রত্যাহারের ওই বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করে পরদিন সারা দেশে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ ঘোষণা করা হয়।
ডিবির ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিওতে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করতে দেখা যায়। তাতে আন্দোলন প্রত্যাহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এতে স্বাক্ষর করেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও নুসরাত তাবাসসুম। ওই দিন ভোরে মিরপুরের একটি বাসার গেট ভেঙে নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।
ওই ভিডিও প্রচারের আগে তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে সমন্বয়কদের ডিবি অফিসে বসে খেতে দেখা যায়। তিনি বলেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে। ডিবি হেফাজতে থাকা সমন্বয়কদের কয়েকজনের পরিবার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে গেলেও তাদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। নাহিদ ইসলামের মা মমতাজ নাহার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সন্তান মা-বাবার কাছেই নিরাপদ। ডিবি অফিসে কীসের নিরাপত্তা?
সমন্বয়করা অভিযোগ করেন—জিম্মি করে নির্যাতনের মুখে ওই বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের গণমাধ্যমে পাঠানো বার্তায় পরদিন সারা দেশে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ ঘোষণা করা হয়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের ভয় বা হুমকি তাদের লক্ষ্য থেকে সরাতে পারবে না বলে ঘোষণা দেন। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, সরকার তাদের আন্দোলনকে নাশকতা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।
ওইদিন বিকাল ৪টা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের তুলে নেওয়ার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সমাবেশ-বিক্ষোভ করেন। তারা অবিলম্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আরিফ সোহেলের মুক্তির দাবি জানান। সমন্বয়কদের জিম্মি ও নির্যাতন করে বিবৃতি দিতে বাধ্য করানোর প্রতিবাদে পরদিন ২৯ জুলাই আবারও রাজপথে আসার ঘোষণা দেন দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা।
মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সেবা ১০ দিন বন্ধ থাকার পর ২৮ জুলাই তা আবার চালু করা হয়। তবে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ রাখা হয়। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দেন। এতে বলা হয়, ৯ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা এ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সারা দেশে গ্রাফিতি, দেয়াল লিখন এবং অনলাইন-অফলাইনে গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। রাজধানীতে পুলিশি বাধার মুখে পড়লেও বিভিন্ন স্থানে দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতিতে অগ্নিঝরা প্রতিবাদ ফুটিয়ে তোলা হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ক্যাম্পাসে দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি কর্মসূচি পালন করেন কার্টুনিস্ট ও চারুকলার শিক্ষার্থীরা। তবে পুলিশি কর্মসূচি শেষ করার আগেই তাদের সরঞ্জাম কেড়ে নেয়। তারপরও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি চোখে পড়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি করা হয়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থীরা আবু সাঈদের হাত উঁচিয়ে গুলির সামনে বুক পেতে দেওয়ার গ্রাফিতি আঁকেন।
দেয়ালগুলোর গ্রাফিতিতে ‘সোনার বাংলা আজ মৃত্যুপুরী কেন?’, ‘আমার ভাইদের মারলি কেন?’, ‘সেভ দ্য কান্ট্রি জয়েন দ্য ফাইট’, ‘পুলিশি হত্যার বিচার চাই’, ‘একদিকে নাটক করে অন্যদিকে গুম করে’, ‘৫২ দেখিনি ২৪ দেখেছি’, ‘সম্পদের হিসাব পরে লাশের হিসাব আগে’, ‘হামার বেটাক মারলু ক্যান’ ইত্যাদি লেখা হয়। গ্রাফিতিতে স্থান পায় ছাদে গিয়ে গুলিতে নিহত ছোট্ট রিয়ার কথাও।
মন্তব্য করুন