প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৪:৩৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে এখনো নেতিবাচক প্রবণতারই আধিক্য রয়েছে বলে মূল্যায়ন করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, শিল্প খাতে তীব্র গ্যাস সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে ‘নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপনকালে এ চিত্র তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি জানান, মোট ৯টি গুরুত্বপূর্ণ খাতের ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে এ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে সরকারের শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবে গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিপিডির প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ও অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার চাপ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়ায় মূল্যস্ফীতির এ সামান্য হ্রাস সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় সুফল আনতে পারেনি।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা। তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে কর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে মারাত্মকভাবে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। সিপিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো বিশাল ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন খাতগুলোতে কাটছাঁটের চাপ বাড়বে।
বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে সিপিডি জানায়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার হারও ঋণাত্মক রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহে জটিলতার কারণে টেক্সটাইল, ইস্পাত, সিরামিক ও পার্টিকেল বোর্ড শিল্পে মারাত্মক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
বৈদেশিক মুদ্রা ও ব্যাংক খাতের পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে কিছুটা বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে প্রবাসী আয় ও বিদেশে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে। অন্যদিকে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ ও ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রয়োগের মতো উদ্যোগ নেয়া হলেও ব্যাংক খাতের সার্বিক সংস্কারে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট নির্দেশিকা বা রোডম্যাপের অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করে সিপিডি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিপিডি সুপারিশ করেছে, বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে আগামী অক্টোবর থেকে জুন সময়কালের জন্য একটি বাস্তবসম্মত 'মূল বাজেট' বা কোর বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, রাজস্ব কাঠামো জোরদার, ব্যাংক খাতের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মন্তব্য করুন