বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ১০:০২ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

দুইবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, জীবনযুদ্ধের অভিজ্ঞতা জানালেন এমিলিয়া ক্লার্ক

বেঁচে যাওয়াই যথেষ্ট নয়, সুস্থ হয়ে ওঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ—নিজের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই উপলব্ধি পেয়েছেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী এমিলিয়া ক্লার্ক। ‘গেম অব থ্রোনস’ সিরিজে ডেনেরিস টারগারিয়েন বা ‘মাদার অব ড্রাগনস’ চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী দুইবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মুখোমুখি হয়েছেন। জীবনসংকট কাটিয়ে অভিনয়ে ফিরে এলেও সেই অভিজ্ঞতার মানসিক ও শারীরিক প্রভাব দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাঁকে।

১৯৮৬ সালের ২৩ অক্টোবর লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন এমিলিয়া ক্লার্ক। ২০২৬ সালে ৪০ বছরে পা দিয়েছেন তিনি। ‘গেম অব থ্রোনস’-এ অভিনয়ের জন্য চারবার প্রাইমটাইম এমি পুরস্কারের মনোনয়ন পেয়েছেন এই অভিনেত্রী। তবে পর্দায় তাঁর সাফল্যের আড়ালে রয়েছে জীবন বাঁচানোর কঠিন লড়াই।

এমিলিয়ার বাবা পিটার ক্লার্ক থিয়েটারে শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। মা জেনিফার ডড ক্লার্ক ছিলেন একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। বাবার কাজের সুবাদে ছোটবেলা থেকেই থিয়েটারের পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় হয় এমিলিয়ার। মাত্র তিন বছর বয়সে ‘শো বোট’ মঞ্চনাটক দেখার পর অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।

স্কুলজীবন থেকেই নাটকে অভিনয় করতেন এমিলিয়া। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারে পড়াশোনা শেষে লন্ডনের ড্রামা সেন্টারে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন। ২০০৯ সালে পড়াশোনা শেষ করে পেশাদার অভিনয়জীবন শুরু করেন তিনি। ২০১১ সালে ‘গেম অব থ্রোনস’ সিরিজে ডেনেরিস টারগারিয়েন চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। চরিত্রটির ক্রমবিকাশ পর্দায় ফুটিয়ে তুলে দর্শকদের মন জয় করেন তিনি। সাদা চুলের ‘মাদার অব ড্রাগনস’ হিসেবে তাঁর উপস্থিতি সিরিজটির অন্যতম পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হয়।

এই চরিত্র তাঁকে আন্তর্জাতিক তারকাখ্যাতি এনে দেয় এবং হলিউডের বড় বাজেটের চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ তৈরি করে। বড়পর্দার পাশাপাশি মঞ্চেও অভিনয় করেছেন এমিলিয়া। ২০১৩ সালে ব্রডওয়ের ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিজ’ নাটকে হলি গোলাইটলি চরিত্রে অভিনয় করেন। পরে লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডেও মঞ্চে কাজ করেন তিনি। ২০১৮ সালে ব্রিটানিয়া পুরস্কার পান এবং ২০১৯ সালে ‘টাইম’ সাময়িকীর বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান করে নেন।

তবে অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বড় ধরনের স্বাস্থ্যসংকটের মুখোমুখি হন এমিলিয়া। ‘গেম অব থ্রোনস’-এর প্রথম মৌসুম সম্প্রচারের সময়, মাত্র ২২ বছর বয়সে, ব্যায়াম করার সময় অসহনীয় মাথাব্যথা অনুভব করেন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে জানা যায়, তাঁর মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম ফেটে গেছে। জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়।

অস্ত্রোপচারের পর শুরু হয় দীর্ঘ পুনর্বাসন। স্মৃতিশক্তি হারানোর আশঙ্কা এবং কথা বলতে না পারার ভয় তাঁকে তাড়া করেছিল। তবু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি আবার ক্যামেরার সামনে ফিরে যান। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে চলছিল শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার কঠিন প্রক্রিয়া।

এমিলিয়া একসময় অনুভব করতেন, যেন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়ে তিনি এমন এক জীবন যাপন করছেন, যা তাঁর পাওয়ার কথা ছিল না। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করতাম— আমার এখানে থাকার কথা নয়। মনে হতো আমি যেন কোনো ভুল করেছি, আর মৃত্যু একদিন এসে আমাকে নিয়ে যাবে।’

২০১৪ সালে আবারও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন এমিলিয়া। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং তাঁকে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করাতে হয়। একদিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় সিরিজের কাজের চাপ, অন্যদিকে জীবন হারানোর ভয়—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয় তাঁকে। তবু অভিনয় চালিয়ে যান তিনি।

দীর্ঘদিন নিজের অসুস্থতার কথা প্রকাশ করেননি এমিলিয়া। রোগটি সম্পর্কে নিজেরও স্পষ্ট ধারণা না থাকা এবং অন্যরা তাঁকে দুর্বল ভাবতে পারেন—এমন আশঙ্কা তাঁকে বিষয়টি গোপন রাখতে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও উদ্বেগ, স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যা, মানসিক ক্লান্তি ও আত্মবিশ্বাসের সংকট দীর্ঘদিন থাকতে পারে।

এ প্রসঙ্গে এমিলিয়া বলেন, ‘যখন সবাই আপনাকে স্বাভাবিক মনে করে, তখন আপনিও নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু বাস্তবে উদ্বেগ, স্মৃতিজনিত সমস্যা, মানসিক ক্লান্তি, আত্মবিশ্বাসের সংকট— এসব অনেক বছর ধরে থেকে যেতে পারে।’

অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ থেকেও আয় করেছেন এমিলিয়া। গহনার ব্র্যান্ড ডিওর, সুগন্ধি ব্র্যান্ড ডলচে অ্যান্ড গাব্বানা এবং প্রসাধনসামগ্রী প্রতিষ্ঠান ক্লিনিকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এসব কাজ তাঁর আয়ের উৎসকে বিস্তৃত করেছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘প্যারেড’ সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে ‘সেলিব্রিটি নেট ওর্থ’-এর হিসাব উদ্ধৃত করে এমিলিয়া ক্লার্কের মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক দুই কোটি মার্কিন ডলার বলা হয়েছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৪০ কোটি টাকা।

এমিলিয়া ক্লার্কের জীবনকাহিনি তাই শুধু তারকাখ্যাতি ও সাফল্যের গল্প নয়; গুরুতর অসুস্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানো এবং সুস্থতার পথে দীর্ঘ লড়াইয়েরও গল্প।

 

মন্তব্য করুন