তরুণ কণ্ঠ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ০৩:০৪ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা সংযুক্ত আরব আমিরাতের, বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধাক্কা

ছবি: সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) হঠাৎ করেই তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে এ ঘটনাকে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে থেকেই ইউএই ওপেকের সদস্য ছিল।

উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর এ সংগঠনটি কয়েক দশক ধরে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও সদস্যদের জন্য কোটা নির্ধারণের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। ১৯৭০-এর দশকের তেলসংকটে ওপেকের ভূমিকা বৈশ্বিক জ্বালানিনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল।

ওপেকে সৌদি আরবের প্রাধান্য থাকলেও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে ইউএইর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। অর্থাৎ বাজারে তেলের দাম কমাতে হলে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষমতা ছিল তাদের। কিন্তু সেই সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছিল ইউএই। তাদের অভিযোগ, ওপেকের কোটা অনুযায়ী দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেলের মধ্যে উৎপাদন সীমাবদ্ধ রাখতে গিয়ে তারা যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। এই কোটার কারণে তাদের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছিল তারা।

এ সিদ্ধান্তের সময়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান যুদ্ধ ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান অস্থিরতার কারণে ইউএইর পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে চাপের মুখে রয়েছে। এর ফলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গেও তাদের টানাপোড়েন বাড়তে পারে।

ওপেকের জন্য এটি বড় ধরনের ধাক্কা। জোটটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও ঐক্য ইতিমধ্যে প্রশ্নের মুখে ছিল। ইউএই যদি সমুদ্রপথ বা পাইপলাইনের মাধ্যমে পূর্ণ মাত্রায় তেল বাজারে আনতে পারে, তাহলে দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করতে পারবে তারা। এর জবাবে সৌদি আরব মূল্যযুদ্ধ শুরু করতে পারে। ইউএইর অর্থনীতি তুলনামূলক বহুমুখী হওয়ায় সে ধাক্কা তারা সামলাতে পারলেও ওপেকের দুর্বল সদস্যদের জন্য তা হবে কঠিন।

আমিরাতের নীতিনির্ধারকেরা ইতিমধ্যে আবুধাবির তেলক্ষেত্র থেকে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সরাসরি ফুজাইরাহ বন্দরে যাবে। বর্তমানে একটি পাইপলাইন চালু থাকলেও উৎপাদন বাড়লে কিংবা উপসাগরে ট্যাংকার চলাচলের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা স্থায়ী হলে আরও সক্ষমতা প্রয়োজন হবে।

তবে এ মুহূর্তে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অবরোধ তেলের বাজারের প্রধান ইস্যু নয়। তার পরও তেল, গ্যাস, জ্বালানি, প্লাস্টিক ও খাদ্যের দামে এখনই তার প্রভাব পড়ছে। বিশ্ববাজারে বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কাছাকাছি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে, আগামী বছরে দাম ৫০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে বলেও ধারণা বিশ্লেষকদের।

বাস্তবতা হলো, ১৯৭০-এর দশকের মতো এখন আর বৈশ্বিক তেলবাজারে ওপেকের প্রভাব নেই। তখন আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত তারা, এখন সেটা নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে। একইভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্বও আগের তুলনায় কমেছে। ওপেকের প্রভাব এখনো আছে, কিন্তু তা একচেটিয়া নয়।

পালাবদলের ইঙ্গিত

সাবেক সৌদি তেলমন্ত্রী শেখ ইয়ামানির একটি বিখ্যাত উক্তি এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য: প্রস্তর যুগ শেষ হয়েছিল পাথর ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে নয়। তেলের বেলায়ও একই কথা সত্য—বিশ্ব ধীরে ধীরে বিকল্প জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

ইউএইর এই সিদ্ধান্ত তাই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা যেতে পারে। চীনের যানবাহন ও রেলব্যবস্থার বিদ্যুতায়নে বড় বিনিয়োগের কারণে ইতিমধ্যে দৈনিক তেলের চাহিদা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল কমেছে। বিশ্বজুড়ে এ ধারা বাড়লে তেলের চাহিদা একসময় স্থিতিশীল হয়ে আসতে পারে। এ বাস্তবতায় তেলের মজুত থেকে যত দ্রুত সম্ভব আয় বাড়িয়ে নেওয়ার কৌশলই অনেকে যুক্তিযুক্ত মনে করছেন। ইউএইর শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও বহুমুখী অর্থনীতি এ কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উপসাগরীয় সংঘাত কবে শেষ হবে এবং তারপর কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে ইউএইর এ সিদ্ধান্ত অন্য দেশগুলোকে একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে, যা সৌদি আরবের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে কিংবা নতুন পাইপলাইন নির্মাণ কার্যকর হলে ওপেকের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ইউএইর তেল উৎপাদন ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমান সংকটে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক তেলবাজারের শক্তির ভারসাম্যই বদলে দিতে পারে।

মন্তব্য করুন