মোঃ আবুল কাশেম

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:৩৯ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

শিশুসাহিত্যিক হুমায়ূন কবীর ঢালী: বাংলা শিশুসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র

৩০ অক্টোবর, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক হুমায়ূন কবীর ঢালীর ৬৩তম জন্মদিবস। ১৯৬৪ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণকারী এই গুণী লেখক আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যের অঙ্গনে নিজের সৃজনশীলতা ও নিরলস সাধনার মাধ্যমে এক বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। সহজ-সরল ভাষা, শিশুমনস্তত্ত্বের গভীর উপলব্ধি এবং আকর্ষণীয় কথনশৈলীর কারণে তাঁর লেখা ছোট-বড় সবার কাছেই দারুণ সমাদৃত। নিজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পরিচিত করেছেন।
হুমায়ূন কবীর ঢালীর পৈতৃক নিবাস চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার সিকিরচর গ্রামে, তবে তাঁর জন্ম বাবার কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা দিয়েই তিনি লেখালেখির সাথে যুক্ত হন। কলেজ জীবনে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশ শুরু হয়। সাহিত্যজীবনের শুরুতে তিনি বড়দের জন্য প্রেমের গল্প ও উপন্যাস লিখলেও পরবর্তীতে উপলব্ধি করেন যে, শিশু-কিশোরদের উপযোগী মানসম্মত বইয়ের বেশ ঘাটতি রয়েছে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজেকে পুরোপুরি শিশু-কিশোর সাহিত্যের প্রসারে নিয়োজিত করেন।
তিনি মূলত কিশোর উপন্যাস, ছোটগল্প, সায়েন্স ফিকশন, ছড়া এবং ভ্রমণকাহিনী রচনায় সিদ্ধহস্ত। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। তাঁর লেখায় বাস্তবজীবনের নানা শিক্ষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌতিক রহস্য এবং বিজ্ঞানমনস্কতার এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ হলো—‘দুষ্টু ছেলের গল্প’, ‘একাত্তরের মিলিটারি ভূত’, ‘নীলগ্রহের রহস্য’, ‘কালোমূর্তি রহস্য’, ‘লজিংবাড়ি’ এবং ভ্রমণভিত্তিক গ্রন্থ ‘বাঙালের আমেরিকা দর্শন’, ‘ব্রিজ টু কানাডা’, ‘জার্নি টু তাজমহল’। প্রতিটি বইয়েই কিশোর মনস্তত্ত্বের টানাপোড়েন ও অ্যাডভেঞ্চার দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
হুমায়ূন কবীর ঢালীর রচনার সবচেয়ে বড় গৌরবময় দিক হলো এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তাঁর একটি জনপ্রিয় শিশুতোষ গল্প 'A Cowboy and a Magic Mango Tree' (মূল বাংলায় 'রাখাল ও জাদুর আমগাছ') গ্রিসের ইয়ানিৎসা শহরের নবম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে একটি বিরল ও গর্বের ঘটনা। এছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও ওড়িশা থেকেও তাঁর বেশ কয়েকটি বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি তাঁর বই আমেরিকা ও নেপাল থেকেও প্রকাশিত হয়েছে, যা ভিনদেশি পাঠকদেরও মুগ্ধ করেছে।
শুধু লেখালেখি করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং শিশুসাহিত্যিকদের একত্রিত করতে এবং নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি ‘বাংলাদেশ শিশুসাহিত্যিক ফোরাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও, সমাজে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে নিজ গ্রামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সামাজিক পাঠাগার আন্দোলন ‘আমাদের পাঠাগার’।
শিশুসাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য হুমায়ূন কবীর ঢালী দেশ ও বিদেশ থেকে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড (২০১২), এম নূরুল কাদের ফাউন্ডেশন শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক (২০০৬), পদক্ষেপ শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১১), ঝুমঝুমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রদত্ত চোখ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৩), নিউ ইয়র্ক থেকে প্রাপ্ত সাউথ এশিয়ান রাইটার্স অ্যান্ড জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ড (২০২১) এবং মর্যাদাপূর্ণ ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড।
হুমায়ূন কবীর ঢালী কেবল একজন সফল লেখকই নন, তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যের এক নিবেদিতপ্রাণ কারিগর। তাঁর প্রাঞ্জল লেখনী ও সৃজনশীলতা আগামী প্রজন্মকে কেবল বিনোদনই দেয় না, বরং সুন্দর মানুষ হতেও অনুপ্রাণিত করে। বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জন্মদিনে এই গুণী লেখকের প্রতি আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

মন্তব্য করুন